ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক স্বল্পস্থায়ী সংঘাত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একদিকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে তা তার কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করে তুলেছে। মাত্র ১৫ ঘণ্টার মধ্যে সংঘাতের অবসান হওয়ায় বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু আবারও বুঝতে বাধ্য হয়েছেন যে আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় তিনি অনেকাংশেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
রোববার হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে নেতানিয়াহু লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়াহে বিমান হামলার নির্দেশ দেন। এর পরপরই ইরান প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়। পরদিন ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইসরাইল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং লোহিত সাগরে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দেয়।
তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এর ফলে ইসরাইলও পরিকল্পিত পরবর্তী হামলা থেকে সরে আসে।
তেল আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান কর্মসূচির পরিচালক রাজ জিমতের মতে, এই ঘটনা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তার ভাষায়, ইরান এখন এমন ধারণায় আস্থাশীল যে ট্রাম্প নতুন কোনো বড় যুদ্ধ চান না, ফলে তেহরান ও তার মিত্ররা আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ইরান ও ইসরাইল উভয়ই নতুন প্রতিরোধ-সমীকরণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ইসরাইল যেখানে সীমান্ত বা অভ্যন্তরীণ হামলার জবাবে দাহিয়াহে আঘাত হানার নীতি অনুসরণ করছে, সেখানে হিজবুল্লাহ ও ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করতে চায়।
সোমবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু ইরান ও হিজবুল্লাহর এই নতুন কৌশলকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারের বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে রাজনৈতিকভাবে এই সংঘাত নেতানিয়াহুকে কিছুটা সুবিধাও দিয়েছে। তার সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন, যিনি প্রয়োজনে ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি আবারও দেখিয়েছে যে ইরান ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত ওয়াশিংটনের হাতেই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি কতটা কার্যকরভাবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ইসরাইলের অনেকের আশঙ্কা, একটি দুর্বল চুক্তি ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলবে।
রাজ জিমত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ফলে ইসরাইল সামরিক সুবিধা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় মূল্য হলো যুদ্ধ কখন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে—সে সিদ্ধান্ত এখন অনেকাংশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। ফলে ট্রাম্প যদি ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত না চান, তাহলে ইসরাইলের বিকল্প খুব সীমিত।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস







