আওয়ামী শাসনের দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর “জুলাই বিপ্লব”-পরবর্তী সময়ে দ্রুত সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটি এখন শুধু নিজেদের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং সারাদেশে তাদের জনসম্পৃক্ততা ও সমর্থন বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় প্রত্যাশা নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত। সে লক্ষ্যে তারা গ্রহণ করেছে চারটি মূল কৌশল—সমন্বিত প্রার্থী বাছাই, ইসলামি ও সমমনাদের ভোট একত্র করা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং প্রার্থী তালিকায় অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা।
সূত্র জানায়, দলের হাইকমান্ড বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে প্রার্থিতাকে আরও “ইনক্লুসিভ” করতে কাজ করছে। এজন্য বিভিন্ন পেশাজীবী, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি উপযুক্ত হলে অমুসলিম প্রার্থীদেরও মনোনয়নের চিন্তা রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি ও সমমনাদের মধ্যে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়াও চলছে—যেখানে জোটের স্বার্থে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে জামায়াত।
এদিকে মাঠপর্যায়ে প্রাথমিকভাবে ঘোষিত প্রার্থীরা ইতোমধ্যে প্রচারণায় সক্রিয়। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবিতে সাত সমমনা দলের সঙ্গে অভিন্ন আন্দোলনও চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নানামুখী যোগাযোগ জোরদার করছে। তবে জামায়াতের উদ্যোগে গঠিত সম্ভাব্য ইসলামি জোটকে দুর্বল করতে কিছু মহল সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ‘আকিদাগত পার্থক্য’-এর অজুহাতে হেফাজতের একটি অংশসহ কিছু কওমি ধারার দল জামায়াতবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, যদিও তৃণমূল পর্যায়ে ঐক্যের পক্ষে চাপ বাড়ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সব ইসলামি ও দেশপ্রেমিক দলের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনি ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা একটি অভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যের পথে এগোচ্ছি, ইনশাআল্লাহ এটি রাজনৈতিক জোটে পরিণত হবে।” তিনি জানান, আসন সমঝোতায় দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হবে। “জনগণ আমাদের পক্ষে রায় দিলে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত,” যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি, সভা-সমাবেশ করছি, এবং ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সুশাসনের বার্তা দিচ্ছি। সংসদকে দক্ষ ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে প্রার্থী মনোনয়নে বৈচিত্র্য আনছি—যেখানে সাবেক আমলা, সেনা কর্মকর্তা, আলেম এমনকি যোগ্য অমুসলিম প্রার্থীরাও থাকতে পারেন।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে অনিয়ম ঠেকাতে সারা দেশে নারী-পুরুষ পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগকালে বলেছেন, “আমরা চাই সুষ্ঠু ভোট হোক—যে-ই জিতুক, তাকে অভিনন্দন জানাব। কিন্তু কেউ ভোট ডাকাতি করতে এলে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে।”
বর্তমানে জামায়াতসহ সাতটি ইসলামি দল (ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাগপা ও জামায়াত) যৌথ আন্দোলনে রয়েছে। তাদের অনেকেই নির্বাচনি জোটে রূপ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নতুন কৌশল, বিস্তৃত জোট ও বাড়তি জনসমর্থন নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
