সংস্কারের আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এবার নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন আট দলের জোট। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এক ব্যালটে ভোট করার লক্ষ্য নিয়ে জোটের ভেতরে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা ও হিসাব–নিকাশ চলছে। তবে চূড়ান্তভাবে কোন দল কতটি আসনে প্রার্থী দেবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি। জোট নেতারা জানিয়েছেন, সমঝোতার কাজ শেষ হলেই তা প্রকাশ করা হবে।
জোটের নেতাদের দাবি, আসন বণ্টনে কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট আসনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, দলীয় সংগঠনের শক্তি, ভোটব্যাংক এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। একই সঙ্গে জোটের শীর্ষ নেতাদের মনোনয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, সেটিকে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। জুলাই-পরবর্তী সময়ে সংস্কার আন্দোলনে একসঙ্গে রাজপথে থাকলেও এবার সেই ঐক্য রূপ নিচ্ছে নির্বাচনী জোট ও আসন সমঝোতায়। যদিও দলগুলোর পারস্পরিক দূরত্বের কারণে এই ধরনের সমঝোতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তুলনামূলক নতুন বলে মনে করা হচ্ছে।
জামায়াতসহ জোটভুক্ত দলগুলো ইতোমধ্যে ৩০০ আসনেই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে জোটের একজন মাত্র প্রার্থী থাকবে। উল্লেখযোগ্য যে, চলতি বছরের শুরুতেই জামায়াতে ইসলামী এককভাবে প্রায় ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে তাদের প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে সক্রিয় রয়েছে। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও গত আগস্টে ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নামার ঘোষণা দেয়। জোটের অন্যান্য দলগুলোও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রার্থী প্রস্তুতি ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
আসন সমঝোতা কীভাবে হবে—এই প্রশ্নে জোট নেতারা বলছেন, ভোটের মাঠে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ও দলের সাংগঠনিক অবস্থানই হবে মূল বিবেচ্য। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, কারও সংগঠন শক্তিশালী, কারও আর্থিক সক্ষমতা বেশি, আবার কারও কর্মী বাহিনী বড়—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা হবে। কোনো দল ছোট হলেও যদি নির্দিষ্ট আসনে তার প্রার্থী শক্ত অবস্থানে থাকেন, তাহলে সেটিও গুরুত্ব পাবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, জোটের প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, যাতে ভেতরে কোনো বিভেদ সৃষ্টি না হয়। তিনি বলেন, শুধু একটি দল নয়, সবাই ঐক্য ধরে রাখার স্বার্থে ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
ভোটার, জনবল ও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে জামায়াতকে জোটের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতে ইসলামী শরিক দলগুলোর জন্য প্রায় ১০০টি আসন ছাড় দিতে পারে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেতে পারে আনুমানিক ৫০টি আসন। বাকি পাঁচটি দলের জন্যও প্রায় ৫০টি আসন ছাড় দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। তবে জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; বরং আসনভিত্তিক শক্তি বিশ্লেষণ করেই প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসান মাহবুব জোবায়ের বলেন, কারা কতটি আসন পাবে—এটি মুখ্য বিষয় নয়। মূল লক্ষ্য হলো, যাকে যে আসনে দেওয়া হবে, তিনি যেন বিজয়ী হতে পারেন। যে দলের যেখানে অবস্থান শক্তিশালী, সেখানে সেই দলই প্রার্থী দেবে এবং অন্যরা তাকে সহযোগিতা করবে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে সমঝোতা চূড়ান্ত হলে একসঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।
জোটের শীর্ষ নেতাদের ধারণা, সামনে আরও কিছু দল এই জোটে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আসন বণ্টন নতুন করে সমন্বয় করা হবে। নেতারা বলছেন, এই জোট কেবল নির্বাচনের জন্য নয়, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
