আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও জটিলতার পর শেষ মুহূর্তে বড় চমক দেখাল জামায়াতে ইসলামী। আন্দোলনরত আট দলের সঙ্গে বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ যোদ্ধাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুক্ত করে ১০ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত মিলছে। একই সঙ্গে ঢাকা-২ আসনে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ও রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান আবদুল হককে প্রার্থী ঘোষণা করায় বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্দোলনরত আট দলের আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ সমঝোতার ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে কর্নেল অলি আহমদসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সময় ও সুযোগের অভাবে এনসিপির নেতারা সেখানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও দলটির সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির বলেন, এটি কেবল একটি জোট নয়, বরং জোটের চেয়েও মজবুত একটি নির্বাচনি সমঝোতা। সারা দেশের ৩০০ আসন নিয়ে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আসন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সমঝোতা প্রায় সম্পন্ন। অবশিষ্ট বিষয়গুলো মনোনয়ন জমার পর আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। আরও কয়েকটি দলের আগ্রহ থাকলেও সময় ও বাস্তবতার কারণে তাদের যুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের পরপরই জামায়াত আমির দেশের প্রায় সব ইসলামি দলের নেতা ও শীর্ষ আলেমদের নিয়ে বৈঠক করেন এবং আগামী নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে সম্মতি পাওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে আট দলের ঐক্যবদ্ধ যাত্রা শুরু হয়। এ জোটে জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
সংস্কার, বিচার, গণভোট ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ নানা দাবিতে এসব দল সারা দেশে কর্মসূচি পালন করে ব্যাপক সাড়া পায়। তৃণমূল পর্যায় থেকেও আসন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে জোরালো মতামত আসে। সে অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বর থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়।
তবে আসন বণ্টন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার সমন্বয়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যেই নতুন দুটি দলের যুক্ত হওয়ায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বিত হলেও জোটের পরিসর বাড়ায় সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ আরও বেড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শোষণ-বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়তে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে এই ঐক্য গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি জানান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে এবং দলটি পৃথকভাবে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাতে সময় খুব কম। ঘোষিত তারিখেই একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তারা। এখনো সবার জন্য সমতল মাঠ নিশ্চিত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের পক্ষপাত, ভয়ভীতি বা অনিয়ম জাতি মেনে নেবে না।
আসন বণ্টন সম্পর্কে তিনি জানান, কোনো একক দল সিদ্ধান্ত নেবে না; ন্যায্যতার ভিত্তিতেই সবার মধ্যে আসন ভাগ হবে। জামায়াত কতটি আসনে নির্বাচন করবে—এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের আভাস অনুযায়ী জামায়াত প্রায় ১৯০টি এবং বাকি নয় দল ১১০টি আসনে প্রার্থী দিতে পারে। এর মধ্যে এনসিপি ৩০টি, ইসলামী আন্দোলন ৩০টির বেশি এবং এলডিপি ছয়টি আসন পেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, বিডিপি, খেলাফত আন্দোলন ও জাগপার শীর্ষ নেতারাসহ জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
