আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, গুম ও খুনের অপরাধে যদি একজনেরও বিচার হয়, তবে তা হবে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল হাসানের। যত ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনাই হোক না কেন, গুম-খুনের বিচার অবশ্যম্ভাবী।
রোববার জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের মামলায় ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। চীফ প্রসিকিউটর বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম-খুনের যে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও কুখ্যাত ব্যক্তিদের একজন জিয়াউল আহসান। তার বিরুদ্ধে শত শত মানুষকে গুম ও হত্যার অকাট্য প্রমাণ প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, জাতির স্বার্থে ও মানবতার স্বার্থে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া জরুরি। অন্যথায় মানবতা ভূলুণ্ঠিত হবে এবং রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।
চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানান, আসামিপক্ষ নানাভাবে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করতে পারে—এ বিষয়টি তারা অবগত। তবে আইনের হাত দীর্ঘ এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে রাষ্ট্র, প্রসিকিউশন ও আদালত সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে এই বিচার হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
রোববার ট্রাইব্যুনাল-১–এ গুম করে শতাধিক মানুষ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে চীফ প্রসিকিউটর তার বিরুদ্ধে গুম-খুনের তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উপস্থাপন করেন।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে র্যাব সদর দপ্তর থেকে অবৈধভাবে আটক সজলসহ তিনজন বন্দীকে নিয়ে জিয়াউল আহসান ও তার দল গাজীপুরের দিকে রওনা হন। ঢাকা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দীদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী এলাকা ও বলেশ্বর নদীর মোহনা ছিল জিয়াউল আহসানের পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘হটস্পট’। গভীর রাতে বন্দীদের ট্রলার বা নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে মাথা বা বুকে বালিশ চেপে গুলি করা হতো। পরে পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।
এই পদ্ধতিকে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোডনামে পরিচালনা করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এভাবে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালানো হতো। আগে থেকেই আটক বা গুম থাকা ব্যক্তিদের বনদস্যু সাজিয়ে গভীর রাতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখানো হতো। এসব অভিযানে র্যাবের বাছাই করা সদস্যরা অংশ নিত এবং অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজে উপস্থিত থাকতেন। এর ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’ নামে তিনটি অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ উপস্থাপন শেষে চীফ প্রসিকিউটর আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানান।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য সময়ের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন এবং আগামী ৮ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
