চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গহীন পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব–৭–এর ডিএডি (উপ-সহকারী পরিচালক) আব্দুল মোতালেব নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এক সোর্সসহ আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জঙ্গল ছলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের অনুসারীরাই এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে।
ঘটনার পর ছলিমপুর, আলীনগর ও লিংক রোড এলাকায় বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গল ছলিমপুরের ভেতরে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার বিকেল তিনটার দিকে বিশেষ গ্রেপ্তার অভিযানে র্যাব সদস্যরা জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করেন। এ সময় ইয়াছিন বাহিনীর সদস্য কালা ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ওমর ফারুক, মো. কাজী ফারুকসহ ৪০০ থেকে ৫০০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করা হয়। সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের মারধর করে এবং একটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে র্যাবের একজন সোর্সসহ তিনজনকে আলীনগরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। পরে থানা পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
র্যাব–৭ সোমবার রাতে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১৯ জানুয়ারি বিকাল চারটার দিকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের অভিযানে গেলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০–৫০০ জন সন্ত্রাসী একযোগে হামলা চালায়। এতে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হন এবং তিনজন গুরুতর আহত হন। আহতরা বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জঙ্গল ছলিমপুরের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সোমবার ওই এলাকায় একটি বিএনপি কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। বিকাল তিনটা থেকে সেখানে রাজনৈতিক সভা চলছিল। বিকাল চারটার দিকে র্যাব সদস্যরা সভাস্থলে প্রবেশ করে আসামি খুঁজতে থাকলে ইয়াছিনের লোকজন হামলা চালায়। হামলার সময় র্যাবের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং তিনজনকে অপহরণ করে আলীনগরের পাহাড়ে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গল ছলিমপুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর ও গফুর মেম্বারের বাহিনী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন মেম্বারের বাহিনী। পরে গত বছরের জুলাইয়ে রোকন বাহিনী ও ইয়াছিন বাহিনীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষে অন্তত দুজন নিহত হন।
পরবর্তীতে ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনীর অভিযানে রোকন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড রেদোয়ান গ্রেপ্তার হন। এর পরদিন ইয়াছিন বাহিনী প্রায় দুই হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিয়ে জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ইয়াছিন আলীনগরের অঘোষিত রাজা হিসেবে পরিচিত। রোকন বাহিনীর পতনের পর ইয়াছিন তার প্রভাব আরও বিস্তৃত করে জঙ্গল ছলিমপুর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর আরও কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়, যেখানে দুইজন নিহত হন এবং সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া একটি বেসরকারি টেলিভিশনের দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় সরকারি খাস পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যই ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান কর্মকাণ্ড। পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও দোকানপাট থেকে মাসিক কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনার পর এই পুরো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে যৌথ বাহিনীর বড় ধরনের অভিযান যে কোনো সময় শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
