বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারে ব্যাপক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো গণভোটে জনগণের স্পষ্ট রায়।
মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাটির আয়োজন করে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট।
আলী রীয়াজ বলেন, গত বছরের জুলাই মাসে টানা ৩৬ দিন ধরে দেশজুড়ে যে গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তা কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্ম, বর্ণ কিংবা মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়; বরং একটি অভিন্ন লক্ষ্যে—বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান—জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জনগণ পরিবর্তনের স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, টানা ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার ফলে নাগরিকদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক জাতীয় নির্বাচনে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান নিজেদের ইচ্ছামতো পরিবর্তনের ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বর্তমান সংবিধান কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এমনকি বিচার বিভাগকেও প্রভাবিত করার সুযোগ পান। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বাধ্যতামূলক হওয়ায় ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ ঘটেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রক্রিয়া তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদীয় কমিটির ২৫টি বৈঠক এবং ১০৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত উপেক্ষা করে কেবল শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে পুরো ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর পরিণতিতে জনগণের ভোটাধিকার কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু কাগজে-কলমে নয়, সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয়, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ এবং উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনের প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ হয়।
রাষ্ট্রের মূলনীতি নিয়ে অপপ্রচারের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিলের কোনো প্রস্তাব নেই। বরং সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সুস্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যে একটি বহু জাতিগোষ্ঠী, বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ—এই বাস্তবতাকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বহাল রেখে অন্যান্য মাতৃভাষাকেও দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদের একটি কমিটির মাধ্যমে—যেখানে ক্ষমতাসীন দল ও প্রধান বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা থাকবেন—আলোচনার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ভোটাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, ভোট দেওয়ার অধিকারই মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার। অন্তত পাঁচ বছরে একবার নাগরিক যেন বলতে পারেন—তিনি কাউকে চান বা চান না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলিক অধিকারও সুরক্ষিত রাখা হয়নি।
সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অপরিবর্তিত থাকলে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, তার ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যাবে। কারণ এই কাঠামোতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়। তাই সংবিধান সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই সংস্কার অপরিহার্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।
