শেরপুরের ঝিনাইগাতিতে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বিএনপির সন্ত্রাসী ও গুন্ডাবাহিনী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে জুবায়ের বলেন, বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের উসকানি ও প্রত্যক্ষ নির্দেশেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জামায়াত মনে করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির সন্ত্রাসীরা আগেই পরিকল্পিতভাবে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা ইউএনও ও পুলিশ প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, যা প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের প্রমাণ। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না এবং পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিএনপির সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ একটি উৎসবমুখর পরিবেশে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, শেরপুরের ঝিনাইগাতির ঘটনাটি তা ভেঙে দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থীদের নিয়ে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিএনপির উসকানির ফলেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী উপজেলা নিয়ে গঠিত শেরপুর-৩ আসনে গতকাল দুপুর আড়াইটায় ঝিনাইগাতি স্টেডিয়াম মাঠে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল। জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল যথাসময়ে উপস্থিত হলেও বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল দেরিতে আসেন। আসনবিন্যাস নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষের সময় পুলিশ প্রশাসন বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতিহত না করে নিষ্ক্রিয় থাকে। পরে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঝিনাইগাতি বাজারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় এবং জামায়াত ও ১১ দলীয় প্রার্থীকে মাঠ থেকে বের হতে বাধা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সন্ধ্যার দিকে প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নেতাকর্মীদের নিয়ে বাজার এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করলে বিএনপির সন্ত্রাসীরা লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় সংঘর্ষে জামায়াতের শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
জুবায়ের বলেন, পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যর্থতা স্পষ্ট। শুরুতেই পুলিশ কার্যকর ভূমিকা নিলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। তবে সংঘর্ষ থামাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ সময় সেনাবাহিনীর এক সদস্য আহত হওয়ায় তার প্রতি সমবেদনা জানানো হচ্ছে।
তিনি অবিলম্বে শহীদ রেজাউল করিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝিনাইগাতি উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে, যার বিষয়ে প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, এলডিপি ও খেলাফত মজলিসসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতারা এবং বিশিষ্ট সাংবাদিকরা।
