ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ সকাল ১১টায় শুরু হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সোমবার এ অধিবেশন আহ্বান করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অধিবেশনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর দেশ একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ পেতে যাচ্ছে।
শুরু থেকেই উত্তপ্ত পরিবেশের সম্ভাবনা
সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই সংসদ শুরু থেকেই সরব হতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ইস্যুতে দুই পক্ষের মতবিরোধ প্রথম দিন থেকেই উত্তাপ ছড়াতে পারে।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগ এর পুনরায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা, রাজধানীর যানজট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এসব বিষয়ও সংসদে আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।
নির্বাচনের ফল ও সংসদ গঠন
১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পায় ২১২টি আসন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পায় ৭৭টি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয়ী হন।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুটি আসনে জয়ী হয়ে একটি ছেড়ে দেন। বর্তমানে এককভাবে বিএনপির আসন সংখ্যা ২০৮।
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী ১৪ মার্চের আগেই অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক ছিল। ১২ মার্চ অধিবেশন ডেকে সাংবিধানিক সময়সীমা রক্ষা করা হয়েছে।
স্পিকার ইস্যুতে জটিলতা
অধিবেশনের শুরুতেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে সাংবিধানিক বাস্তবতায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার Shirin Sharmin Chaudhury পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কারাবন্দি থাকায় তারা প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে পারছেন না। ফলে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা এখনো চূড়ান্ত নয়।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি অথবা সিনিয়র সদস্য প্রথম বৈঠক পরিচালনা করতে পারেন। ১৯৭৩ সালের সংসদের প্রথম বৈঠকে সিনিয়র সদস্যের মাধ্যমে অধিবেশন পরিচালনার নজির রয়েছে।
সিনিয়র সদস্যদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জয়নুল আবদিন ফারুক ও হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় রয়েছে।
বিরোধী দলের প্রস্তুতি
বিরোধী দল সংসদকে কার্যকর করতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের সংসদ সদস্যদের সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির Shafiqur Rahman বলেছেন, তারা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান। সরকার জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নিলে তারা সমর্থন দেবে; অন্যথায় সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
সরকারি দলের প্রত্যাশা
সরকারি দলের মতে, এবার সংসদ বয়কটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি কার্যকর বিরোধী দলকে দেখা যাবে।
নরসিংদী-৫ আসনের বিএনপি এমপি ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, “আগের সংসদগুলো ছিল একপাক্ষিক। এবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রকৃত ভূমিকা রাখবেন।”
রাষ্ট্রপতির ভাষণ, দ্রব্যমূল্য, গ্যাস সংকট, যানজটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে তুমুল বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ইস্যু আলোচনা তৈরি করলেও বড় সংকট তৈরি করবে না।
তিনি বলেন, “বিরোধী দলের প্রশিক্ষণ নেওয়া নজিরবিহীন ঘটনা। এতে বোঝা যায় তারা প্রস্তুত হয়ে সংসদে যাচ্ছে। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিজ্ঞতা অতীতে সুখকর ছিল না—এবার কী হয় সেটাই দেখার বিষয়।”
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ শুরু থেকেই উত্তপ্ত, বিতর্কমুখর এবং সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—এই উত্তাপ কতটা গঠনমূলক রাজনীতিতে রূপ নেয়।
