বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাধারণত ব্যারেল হিসেবে নির্ধারিত হলেও এর আসল মূল্য লুকিয়ে থাকে রাসায়নিক গঠনে। আর এই রাসায়নিক কাঠামোর কারণেই ইরানের তেলের চাহিদা বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী। মূলত তেলের ঘনত্ব এবং সালফারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় কোন তেল থেকে কত সহজে পেট্রোল বা ডিজেল উৎপাদন করা সম্ভব।
তেল শোধনাগারের ভাষায় একে বলা হয় API gravity। ইরানের “ইরানিয়ান লাইট” তেলের API সাধারণত ৩৩ থেকে ৩৬ ডিগ্রি এবং সালফারের পরিমাণ ১.৩৬ থেকে ১.৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। এই গঠনকে শোধনাগারগুলোর জন্য ‘আদর্শ’ ধরা হয়। কারণ এটি যথেষ্ট হালকা হওয়ায় সহজে প্রচুর পরিমাণ পেট্রোল ও ডিজেল পাওয়া যায়, আবার এটি এমন এক মাঝামাঝি স্তরের তেল যা প্রক্রিয়াজাত করতে অতিরিক্ত জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না।
অন্যদিকে, বিকল্প তেলের গঠন ভিন্ন হওয়ায় ইরানি তেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। যেমন— ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী এবং এতে প্রচুর সালফার থাকে, যা শোধন করা বেশ ব্যয়বহুল। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেল অত্যন্ত হালকা ও পরিষ্কার হওয়ার কারণে এটি থেকে প্রয়োজনীয় ভারী জ্বালানি পাওয়া যায় না। ফলে অনেক শোধনাগারকে বাধ্য হয়েই WTI-এর সাথে ভারী তেল মিশিয়ে কাজ চালাতে হয়।
এই মলিকুলার বা রাসায়নিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই গত ২০ বছর ধরে নানা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনেক দেশ দুবাইয়ের গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরানি তেল সংগ্রহ করেছে। ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশ সবসময়ই এই তেলের স্থায়ী গ্রাহক। কারণ সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় এই তেল ব্যবহার করলে শোধনাগারগুলোর খরচ অনেক কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে শুধু তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়া নয়, বরং বিশ্বের সেরা রাসায়নিক গঠনের তেলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের যে মূল্য, তার মধ্যে কেবল সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং তেলের এই বিশেষ গুণগত মান বা “মলিকুলার ওয়েট”-এর মূল্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই কারণেই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও ইরানি তেলের কদর কমেনি।
