ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ভোলা–৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। একই সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন নেত্রকোনা–১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সংসদের কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তাদের নির্বাচিত করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং ক্রীড়াবিদ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভোলা–৩ আসন থেকে তিনি টানা ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের জন্ম ভোলার লালমোহনে। তার বাবা আজাহার উদ্দিন আহম্মদ একজন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধী দলের ডেপুটি নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তার মায়ের নাম করিমুন্নেছা। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন সবার বড়।
শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬১ সালে আইএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষে ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে তিনি যশোরের জগদীশপুর এলাকায় শীতকালীন প্রশিক্ষণে ছিলেন। ২৫ মার্চের পর ইউনিটকে সেনানিবাসে ডাকা হলে ২৯ মার্চ তারা ফিরে আসেন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে তিনি ভারতে যান এবং কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজ এলাকায় যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
ক্রীড়া অঙ্গনেও তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় হিসেবে বিভিন্ন দেশে খেলেছেন এবং ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কও ছিলেন।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ভোলা–৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।
১৯৯২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তিনি ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৯৬ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাটমন্ত্রী, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পানিসম্পদমন্ত্রী এবং ২০০৬ সালে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ১২ মার্চ ২০২৬ সালে তাকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
