বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা অঙ্গনের একসময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তার বিরুদ্ধে শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পক্ষে সংগঠিত প্রচারণা ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, ‘ইটসমিস্বাধীন’ (ItsMeSwadhin) নামের ফেসবুক আইডিসহ একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক ‘অর্ধসত্য’ তথ্য ব্যবহার করে জিয়াউল আহসানের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
গুমের শিকার প্রকৌশলী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী জানান, জিয়াউলের আত্মীয় পরিচয়ে একটি আইডি থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। একই ব্যক্তি ইনস্টাগ্রামেও সক্রিয় থেকে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিস্তারিত চিত্র
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগপত্রে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অপরাধের তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ২০১১ সালে গাজীপুরে একটি অভিযানে তিনজনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ‘জলদস্যু দমন’-এর নামে বরগুনা ও বাগেরহাট এলাকায় অন্তত ৫০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
২০১৪ সালের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার এক আসামিও আদালতে জবানবন্দিতে দাবি করেন, ওই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ জিয়াউল আহসানের কাছ থেকেই এসেছিল।
এনটিএমসি ও নজরদারি বিতর্ক
জিয়াউল আহসানের ক্ষমতার অন্যতম উৎস ছিল এনটিএমসি। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে এই সংস্থাকে ব্যক্তিগত নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের ফোনালাপ ফাঁস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
বর্তমান তদন্তে এনটিএমসির সার্ভার থেকে বিভিন্ন অডিও ও তথ্য উদ্ধার হয়েছে, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, গোপন স্থানে আটকে রেখে তাদের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ও ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিতভাবে একই ধরনের বার্তা ছড়িয়ে কৃত্রিম জনমত তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, যা ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ নামে পরিচিত।
এ ধরনের প্রচারণায় অনেক সময় ‘আয়নাঘর’ ইস্যুকে অস্বীকার করা হচ্ছে কিংবা মানবিক দিক তুলে ধরে অভিযুক্তকে সহানুভূতির পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এটি গুরুতর অভিযোগগুলোকে আড়াল করার একটি কৌশল।
বিচারপ্রক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এবং তার অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেওয়া হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা বা জনমত বিচারকে প্রভাবিত করার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
