আবদুল কাদির খান বা এ কিউ খান ছিলেন পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান স্থপতি। সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনার মাঝে উঠে এসেছে এই বিজ্ঞানীর নাম। তিনি কেবল পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র বানাননি, বরং পশ্চিমাদের আধিপত্য রুখতে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও লিবিয়ার মতো দেশগুলোর কাছেও পারমাণবিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানও একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো একে পাকিস্তানের টিকে থাকার ‘চাবিকাঠি’ হিসেবে দেখেছিলেন। হল্যান্ডের ইউরেনকো কোম্পানিতে কাজ করার সুবাদে এ কিউ খান অতি গোপনীয় গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ ব্যবস্থার নকশা আয়ত্ত করেছিলেন। তিনি দেশে ফিরে রাওয়ালপিন্ডিতে গবেষণাগার স্থাপন করেন এবং ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষার মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিশ্বের সপ্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করেন।
ইসরায়েল শুরু থেকেই কোনো মুসলিম দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার তীব্র বিরোধী ছিল। আশির দশকে ইসরায়েল ও ভারত মিলে পাকিস্তানের কাহুতা পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার পরিকল্পনাও করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এ কিউ খান মনে করতেন, পারমাণবিক সক্ষমতা থাকলে ইরাক বা লিবিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব হতো না। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্র কোনো আগ্রাসন নয়, বরং একটি বড় প্রতিরোধক শক্তি (ডিটারেন্ট)।
আশির দশকে ইরান যখন ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন তারা আত্মরক্ষার তাগিদে পাকিস্তানের সহায়তা চায়। এ কিউ খান বিশ্বাস করতেন, মুসলিম দেশগুলোর হাতেও ‘ইসলামি বোমা’ থাকা উচিত। তিনি কয়েক হাজার ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ এবং নকশা ইরানকে সরবরাহ করেছিলেন। এমনকি লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির জন্যও ছদ্মবেশে পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির কাজ করেছিল তাঁর নেটওয়ার্ক। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে গাদ্দাফি এই গোপন তৎপরতা ফাঁস করে দিলে পুরো নেটওয়ার্কটি ভেঙে পড়ে।
এ কিউ খান পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে প্রযুক্তি দিয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। সিআইএ এবং মোসাদ তাঁকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করলেও পাকিস্তানে তিনি ‘মোহসিন-ই-পাকিস্তান’ বা জাতির রক্ষক হিসেবে সমাদৃত। ২০২১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং মুসলিম বিশ্বের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষেই তাঁর অবস্থান ধরে রাখেন।
