বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে কানাডায় বিলাসবহুল সাম্রাজ্য গড়েও শান্তিতে নেই এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ লাবু। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ছোট ভাই এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের বেয়াই লাবুর পিছু নিয়েছে কানাডার কুখ্যাত মাফিয়া চক্র। মোটা অঙ্কের চাঁদার দাবিতে মাফিয়ারা তাঁর মন্ট্রিয়ালের বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও গুলি চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে কুইবেক প্রদেশের অভিজাত এলাকা বিকনসফিল্ডে লাবুর প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়িতে হানা দেয় মাফিয়া সদস্যরা। তারা লাবু ও তাঁর পরিবারকে তৃতীয় কোনো পক্ষের হয়ে পাওনা পরিশোধের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেয়। দাবি পূরণ না হওয়ায় লাবুর বাড়ির সামনে থাকা একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। বিষয়টি দীর্ঘদিন আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি মন্ট্রিয়াল পুলিশ এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করার পর ফরাসি পত্রিকা ‘লা প্রেস’ এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পুরো বিষয়টি সামনে আনে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন মরেনো গ্যালো জুনিয়র, যিনি মন্ট্রিয়ালের শক্তিশালী ইতালীয় মাফিয়া গোষ্ঠীর সদস্য। অন্যজন ভ্লাদিমির লাগ্যুরে, যিনি অপরাধ জগতে ‘স্ট্রংম্যান’ হিসেবে পরিচিত। তদন্তে উঠে এসেছে যে, হামলাকারীরা লাবুর বাড়িতে থাকাকালীন বাংলাদেশও ফোন করেছিল। তবে তারা নিজেদের স্বার্থে নাকি অন্য কারও নির্দেশে এই হামলা চালিয়েছে, তা এখনও তদন্তাধীন।
আব্দুস সামাদ লাবুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, তিনি ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও জাল কাগজের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ কানাডায় পাচার করেছেন। কানাডায় তাঁর আবাসন ব্যবসায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘রুনা করপোরেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, যার সঙ্গে একসময় বিতর্কিত পি কে হালদারও যুক্ত ছিলেন।
লাবুর পারিবারিক সম্পর্কও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাঁর ছেলে আতিকুলের সঙ্গে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও বিদেশে সম্পদ পাচারের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর তিনি বর্তমানে পলাতক। আত্মীয়তার সূত্রে এই পরিবারগুলো কানাডাকে তাঁদের অবৈধ অর্থের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
এদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কাজ শুরু করেছে। কানাডার আর্থিক খাত মনিটরিং সংস্থা ‘ফিনট্র্যাক’ থেকে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে সরাসরি আইনি চুক্তির অভাবে সম্পদ জব্দ করে দেশে ফিরিয়ে আনা জটিল হয়ে পড়েছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ টিম কানাডার অটোয়াতে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
