ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে বিবেচিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একাংশ হঠাৎ করে ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সূত্র জানায়, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের ১০৪ কিলোমিটার অংশকে অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে সক্রিয় রয়েছে একটি সংগঠিত চক্র। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অধিকাংশই পরিচিত মুখ নন, এবং তাদের অনেকেই নগদ অর্থের বিনিময়ে এসব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে দিয়ে এসব মিছিলে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বলে তদন্তে জানা গেছে।
অর্থায়ন ও নেতৃত্বের অভিযোগ
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচিগুলোতে আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের কিছু পলাতক নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধি। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত সভাপতি মিনহাদুল হাসান রাফি গ্রেপ্তার হলেও সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল পিয়াস এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ইসরাফিলের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি ঝটিকা মিছিলে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করলেও মূল সংগঠকদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, এ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক এহেতাসামুল হাসান রুমীর। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতে, রুমীকে নেপথ্যে সহায়তা করছেন কুমিল্লা-১১ আসনের সাবেক এমপি মুজিবুল হক এবং কুমিল্লা-৬ আসনের সাবেক এমপি বাহাউদ্দিন বাহার।
নাশকতার পরিকল্পনায় গ্রাম বিশেষভাবে সক্রিয়
বুড়িচং উপজেলার আবিদপুর গ্রামকে কেন্দ্র করেই এসব নাশকতার পরিকল্পনা হচ্ছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের দাবি। বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আজিজুল হক জানান, এই গ্রামে অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তি প্রভাব বিস্তার করছে, যাদের নেতৃত্বে কাজ করছে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডাররা। তাদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ মিয়ার ছেলে মুজিবুর রহমান এবং আব্দুল খালেকের ছেলে আবু আহমেদ।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর, পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে আবিদপুর গ্রামে একটি গোপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে যুবলীগের ক্যাডার মুজিবুর রহমানের বাড়িতে কেক কাটা হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও প্রধান আয়োজক এখনো পলাতক।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে তৈরি করা হচ্ছে। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি কাজী জুবায়ের আলম জিলানী বলেন, “নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ টাকার বিনিময়ে টোকাই শ্রেণির লোক দিয়ে মহাসড়কে মিছিল করছে। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এটি তাদের ব্যর্থতা।”
বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি এটিএম মিজানুর রহমান বলেন, “মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতারা। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া।”
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার আশঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমরান আনসারী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে যাওয়ার পর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশে অবস্থানরত নেতারা নতুন করে সংগঠিত হয়ে দেশে ঢোকার চেষ্টা করতে পারেন।” তিনি সরকার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর প্রতি সীমান্তে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানান।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. নাজির আহমেদ খান বলেন, “সীমান্ত এলাকাসহ যেকোনো স্থানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। ইতোমধ্যে কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
