২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণও হারায়। তবে এক বছর পর স্থানীয় পর্যায়ের তিনটি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটিকে কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম নগর নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচন—যা স্থানীয় নির্বাচন হলেও বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি ছিল এর দিকে।
এই নির্বাচনে নজরের কেন্দ্রে ছিলেন আফ্রিকান বুদ্ধিজীবী মাহমুদ মামদানি ও ভারতীয় নির্মাতা মীরা নায়ার দম্পতির ছেলে, উদীয়মান মুসলিম রাজনৈতিক নেতা জোহরান মামদানি (৩৪)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোকে জেতাতে মরিয়া ছিলেন, কিন্তু মামদানি বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন।
এই বিজয়ের পেছনে ছিল ইহুদিবাদ, পুঁজিবাদ, ধর্মীয় বর্ণবাদ ও বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের প্রবল চাপকে অতিক্রম করার কঠিন লড়াই। মামদানির সামনে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, ‘চরমপন্থি’ ও ‘ইহুদিবিরোধী’ তকমা লাগানোর চেষ্টা—সবই হয়েছিল। কিন্তু এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তরুণ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নিউ ইয়র্কবাসীর কাছে।
গত কয়েক দশক ধরে করপোরেট রাজনীতি ও পুঁজিবাদের প্রভাবে সংজ্ঞায়িত আমেরিকান জীবনে মামদানির কঠোরতাবিরোধী রাজনীতি, ফিলিস্তিন সংহতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন শক্তিশালী সাড়া ফেলেছে। বিশ্বায়নের নামে যে চিন্তাধারা করপোরেট স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তার বিরুদ্ধে এই বিজয়কে একটি প্রতীকী বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও দমন–পীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া মানেই ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচিত—এমন প্রচলিত বয়ান এবার ভেঙে পড়েছে। গাজায় গণহত্যা ও পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ ঢাকতে হলোকস্ট-নির্ভর বয়ানও আর কার্যকর হয়নি।
নৈতিক প্রশ্নে ইহুদিবাদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়েছে—হলোকস্টকে উপনিবেশবাদী সহিংসতার সাফাই হিসেবে ব্যবহার করায় এর নৈতিক ভিত্তির ক্ষয় হচ্ছে। নোয়াম চমস্কি, নরম্যান ফিনকেলস্টাইন, ইলান পাপ্পের মতো বুদ্ধিজীবীরা বহুদিন ধরে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসলেও পশ্চিমা সরকারগুলো কর্ণপাত করেনি। ফলে জনগণের অনুভূতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক নীতির মধ্যে এক গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
মামদানির মনোনয়ন ও বড় জয় দেখিয়েছে যে করপোরেট মিডিয়া ও ইহুদিবাদী মতাদর্শিক কাঠামোর চাপ থাকলেও জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশের ক্ষমতা রাখে।
ভারতের উদারপন্থি বুদ্ধিজীবী ও হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থিরা মামদানির প্রতি অস্বস্তি প্রকাশ করেছে—যদিও তারা কমলা হ্যারিস বা ঋষি সুনাকের বিজয় উদ্যাপনে বেশ উৎসাহী ছিল। কারণ মামদানি নিজেকে স্পষ্টভাবে মুসলিম পরিচয়ে তুলে ধরেন এবং ইহুদিবাদ ও হিন্দুত্ববাদ—দুই মতাদর্শকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তার অবস্থান বিদ্যমান বৈষম্যমূলক কাঠামোর স্বার্থের বিরুদ্ধে, তাই ভারতীয় মূলধারার অভিজাতরা তাকে স্বাগত জানাতে অনাগ্রহী।
এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ অভিজাতদের মধ্যেও ইসলামবিদ্বেষের গভীর বদ্ধমূলতার বহিঃপ্রকাশ। মুসলিম পরিচয় যদি পুঁজিবাদী উদারনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, তবেই তারা তা গ্রহণ করে—মামদানির ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নেই।
বিশ্বজুড়ে যখন অন্ধকারময় রাজনীতির বিস্তার, সেই সময়ে মামদানির জয় আধিপত্যবাদ, পুঁজিবাদ ও ইহুদিবর্ণবাদের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করার এক বিরল আলোকরেখা। আধিপত্যবাদী শক্তি চাইলেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধ ও ভাঙনের মুখে তা আর টেকসই নয়। ন্যায়বিচারের স্বপ্ন যারা দেখেন, তাদের জন্য জোহরান মামদানির মনোনয়ন ও উজ্জ্বল বিজয় আশা ও সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে।







