নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২২ দিন বাকি। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। নতুন সরকারকে বরণে প্রস্তুতি চললেও প্রশাসনের কেন্দ্র সচিবালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। নীতি–নির্ধারণী কাজ প্রায় থমকে আছে; চলছে মূলত রুটিন কার্যক্রম।
দেড় বছর পেরোলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি বলেই মত সাবেক আমলাদের। আমলাতন্ত্র ও ‘লালফিতা’র প্রভাব আগের মতোই রয়ে গেছে; জনভোগান্তি কমেনি, বরং কোথাও কোথাও বেড়েছে। নিরপেক্ষতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য, দাবি আদায়ের নামে প্রশাসন অচল করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ।
সাবেক আমলাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর বড় সুযোগ তৈরি হলেও সরকারের দুর্বল উদ্যোগ এবং আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সংস্কার এগোয়নি। একই সঙ্গে আমলাতন্ত্রকে নিজেদের পক্ষে টানতে রাজনৈতিক দলগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাও পরিস্থিতি জটিল করেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন এখন কার্যত তিন ধারায় বিভক্ত। পদোন্নতি, পদায়ন ও ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে আগেভাগেই।
তবে প্রশাসনজুড়ে স্থবিরতার অভিযোগ মানতে নারাজ খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, নির্বাচনমুখী হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মনে হতে পারে, তবে সার্বিকভাবে প্রশাসন সরকারের কাজে সহযোগিতা করছে।
মুয়ীদ কমিশনের প্রস্তাবে অচলাবস্থা
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের (মুয়ীদ কমিশন) খসড়া প্রস্তাব প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। উপসচিব ও যুগ্মসচিব পর্যায়ে পরীক্ষাভিত্তিক পদোন্নতি, ক্যাডারভিত্তিক কোটা পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ক্যাডার সার্ভিস থেকে আলাদা করা এবং ক্যাডার গুচ্ছায়নের সুপারিশে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা একত্রিত হয়ে বিরোধিতা করেন। এক পর্যায়ে প্রশাসনে অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা সরকার আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে মন্তব্য শীর্ষ আমলাদের।
সম্পদের হিসাব ও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ায় প্রশাসনে অস্বস্তি তৈরি হয়। বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর হিসাব যাচাইয়ের সক্ষমতা না থাকায় ভীতি ছড়ায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশে পরিবারের স্থায়ী বসবাসের অভিযোগে দুদক তথ্য চাইলে মন্ত্রণালয়গুলোর অনাগ্রহও সমালোচনার জন্ম দেয়।
আমলাতন্ত্র বনাম সরকার
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে, ফলে সরকার নতিস্বীকার করেছে এবং সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
ত্রিধাবিভক্ত প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের সরকারের সুবিধাভোগী, বিএনপি ও জামায়াতপন্থি— এই তিন বলয়ের টানাপোড়েনে প্রশাসন স্থবির। আগের আমলের দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালীদের বহাল রাখাকে বড় ভুল বলছেন অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ আমলারা। তাদের মতে, দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিলে প্রশাসন সঠিক পথে দাঁড়াতে পারত।
নতুন সরকারের অপেক্ষা
এখন প্রশাসনের আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন ও নতুন সরকার। নীতি–নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকায় অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে কাজ স্থবির। বিশেষজ্ঞরা এটিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, আমলাতন্ত্রকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা না গেলে কল্যাণরাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়। সামনে যে সরকারই আসুক, এই স্থবিরতা কাটানোই হবে তার বড় চ্যালেঞ্জ।







