নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্তরঙ্গ ভিডিওগুলো নিয়ে শুরু থেকেই ছিল তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠার পরপরই তিনি দাবি করেছিলেন, ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য তার সম্মানহানি করা।
তবে অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট–এর দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। তাদের দাবি, ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোর মধ্যে অন্তত তিনটি ক্লিপ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে—এসব ভিডিও কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়। বরং বাস্তব ভিডিও, যেগুলোর সম্পাদনা বা এআই জেনারেশনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে ভিডিওগুলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। দ্য ডিসেন্ট জানায়, তারা আলাউদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের মোট ১০টি ভিডিওর মূল কপি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব ভিডিও ফাইল ৭ জন ভিন্ন নারীর নামে সংরক্ষিত ছিল। প্রতিটি ভিডিও আলাদা করে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে উপস্থিত নারীদের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন, যা পৃথক ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করে। যদিও তাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
ভিডিওগুলোর বিস্তারের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সুনামগঞ্জ ও হাতিয়ার কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলা হয়। সুনামগঞ্জের একজন সাংবাদিক জানান, ২০২৫ সালের জুন মাসে তিনি প্রথম এসব ভিডিওর স্ক্রিনশট দেখেন। তার দাবি, স্থানীয় আরেকজন সাংবাদিক তাকে ব্লুটুথের মাধ্যমে দুটি স্ক্রিনশট পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে দেখা যায়, মেটাডাটায় ‘ট্রান্সফার টাইম’ হিসেবে ১০ জুন বিকাল ৪টা ৪৮ মিনিট উল্লেখ রয়েছে।
এই সূত্র ধরেই অনুসন্ধান এগোতে থাকলে উঠে আসে শাল্লা উপজেলা ভূমি অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী রাজু রায়ের নাম। স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালে আলাউদ্দিন পরিবার ছাড়া সরকারি ডাকবাংলোয় থাকতেন এবং তার খাবার নিয়মিত আসত রাজুর বাসা থেকে। এই ঘনিষ্ঠতার সুযোগে রাজু তার ব্যক্তিগত নানা তথ্যের নাগাল পান।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, একদিন ফোনালাপে আলাউদ্দিনকে বলতে শোনা যায় যে, একটি পেনড্রাইভে সংশ্লিষ্ট নারীদের ভিডিও সংরক্ষিত আছে। এই তথ্য থেকেই রাজু পেনড্রাইভটি হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরে একসময় সুযোগ পেয়ে সেটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভিডিওগুলো মোবাইলে কপি করেন। পরবর্তীতে সন্দেহ এড়াতে পেনড্রাইভটি আবার গোপনে ফিরিয়ে দেন।
এর কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ। শাল্লা ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা, যারা নাম প্রকাশ করতে চাননি, জানিয়েছেন—ভিডিওগুলো দেখিয়ে আলাউদ্দিনের কাছ থেকে অর্থ ও সম্পদ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে রাজুকে বড় অঙ্কের টাকা এবং বাজার এলাকায় জমি দেওয়ার কথাও শোনা যায়। তবে ভিডিওগুলো মুছে ফেলার আগে সেগুলো অন্য একজন সাংবাদিকের কাছে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এইভাবে ভিডিওগুলো একাধিক হাত ঘুরে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়। যাদের মধ্যে কয়েকজন আবার তা অন্যদের দেখান, ফলে বিষয়টি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজু রায় বলেন, ঘটনাটি দুই বছর আগের এবং তিনি তখনই ভিডিওগুলো মুছে ফেলেছেন। ভিডিওতে থাকা নারীদের কাউকেই তিনি চেনেন না বলেও দাবি করেন।
অন্যদিকে, আলাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
ভিডিওগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রশাসনিকভাবেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মোহাম্মদ আলাউদ্দিনকে হাতিয়া উপজেলার ইউএনও পদ থেকে সরিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব মু. তানভীর হাসান সুমন।
ঘটনাটি এখন কেবল একটি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পাশাপাশি, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে যে যুক্তি সামনে আনা হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ায় বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।







