১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কমনওয়েলথ থেকে পাকিস্তানকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এমনকি যে সব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল, তাদের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তবে মাত্র দুই বছরের মাথায় সেই অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে ১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লাহোর বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভুট্টো।
লাহোরে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স বা ওআইসি-র দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে শেখ মুজিবুর রহমানের এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিমানবন্দরে তাকে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয় এবং বাজানো হয় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকার পর এটিই ছিল তার প্রথম পাকিস্তান সফর। মূলত আগের দিন, অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরই শেখ মুজিব লাহোরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
ভুট্টোর এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি জোরালো কারণ ছিল। প্রথমত, বাংলাদেশের হাতে থাকা ৯০ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ফেরত নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ ছিল। দ্বিতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের ওপর প্রবল কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। ২২ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতির ঘোষণা দেওয়ার সময় ভুট্টো নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, বন্ধু ও ভাই রাষ্ট্রগুলোর পরামর্শেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মুসলিম বিশ্বনেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি এই ইতিবাচক মনোভাব তৈরির পেছনে শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতি বড় ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক দল ও চা পাঠিয়ে আরব দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের ফলে সৌদি আরব, মিশর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো পাকিস্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বাংলাদেশকে ওআইসি সম্মেলনে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করে।
সম্মেলনের একটি অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ছিল লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির ভূমিকা। লাহোরের ঐতিহাসিক শালিমার গার্ডেনে এক নৈশভোজের সময় গাদ্দাফি একদিকে শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাত উঁচিয়ে ধরে আরবিতে ‘আখি, আখি’ (ভাই, ভাই) বলে চিৎকার করে ওঠেন। দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধের তিক্ততা কমিয়ে ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এই বিশেষ কূটনৈতিক নাটক সাজানো হয়েছিল বলে জানা যায়।
তবে এই সফর এবং পাকিস্তানের স্বীকৃতি তৎকালীন বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। একপক্ষ যেমন একে আন্তর্জাতিক বিজয় হিসেবে দেখেছিল, অন্যপক্ষ যুদ্ধের মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে পাকিস্তান সফরকে সহজভাবে নিতে পারেনি। তবুও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানের স্বীকৃতি পেলে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায় সহজ হবে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হবে। তার সেই কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।







