বিগত বছরের তুলনায় এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮.৯৫ শতাংশ, নিহত ৮.২৬ শতাংশ এবং আহত ২১.০৫ শতাংশ। সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও ১,০৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত হন। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত এবং ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১,২৮৮ জন আহত হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২,১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন। চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের গত ১৫ দিনের হতাহতের তুলনায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেশি বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
ঈদযাত্রা শুরু ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত ও ১১৪ জন আহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬.১২ শতাংশ।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ৭১ জন চালক, ৫৫ জন শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, ৭ জন শিক্ষক, ৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন রাজনৈতিক কর্মী, ৩ জন প্রকৌশলী, ২ জন সাংবাদিক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১ জন চিকিৎসক।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল ২৭.১৬ শতাংশ, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ১৭.৭৩ শতাংশ, বাস ১৬.২২ শতাংশ, ব্যাটারিচালিত রিকশা ১৫.২৮ শতাংশ, কার-মাইক্রো ৮.৪৯ শতাংশ, নছিমন-করিমন ৭.৭৩ শতাংশ এবং সিএনজি অটোরিকশা ৭.৩৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২.৩৬ শতাংশ পথচারী চাপা, ২২.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া এবং বাকি অংশ অন্যান্য কারণে ঘটেছে। স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে ৪৩.০৬ শতাংশ দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২১.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে ঘটে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রমজান ও ঈদযাত্রা শুরু হওয়ায় ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে যাত্রীদের স্বার্থে প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে ভাড়া নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো।
দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি বিভিন্ন সুপারিশও দিয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদার, সড়কে আলোকসজ্জা বৃদ্ধি, দক্ষ চালক তৈরি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি বন্ধ, আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সড়ক নিরাপত্তা গবেষণা ইউনিট চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।







