সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে পৃথক বিল উত্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহালের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আলাদাভাবে তিনটি বিল উত্থাপন করেন। বিলগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা হবে এবং আগামী বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার সেগুলো আলোচনায় আসতে পারে।
তবে বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে ওইদিন সংসদে কিছু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কার্যসূচি অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল যে বিলটি উত্থাপনের নির্দেশ দেন, আইনমন্ত্রী তা না তুলে অন্য একটি বিল উপস্থাপন করেন। পরে বিষয়টি সংশোধনের চেষ্টা করা হলে একই বিল পুনরায় উত্থাপিত হয়। ফলে একটি বিল একাধিকবার উত্থাপনের ঘটনা ঘটে, আর কার্যসূচিতে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিলটি উত্থাপিতই হয়নি।
পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী এ ত্রুটির কথা স্বীকার করে বলেন, একটি বিল অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে গেছে। যদিও শুরুতে স্পিকারের ভুল হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করা হয়, কার্যসূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্পিকার যথাযথভাবেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সংসদের ওইদিনের বৈঠকে নিয়মিত কার্যসূচির বাইরে দুটি সম্পূরক কার্যসূচি যুক্ত করা হয়, যা উভয়ই আইন প্রণয়নসংক্রান্ত ছিল। কিন্তু নির্ধারিত ক্রম অনুসরণ না হওয়ায় বিল উপস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয় এবং একই বিল বারবার উত্থাপনের নজির তৈরি হয়।
এদিন জাতীয় সংসদে সাতটি বিল পাস হয়, যার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিলগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই কণ্ঠভোটে পাস করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি বিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন দেওয়া হয় এবং একটি বিলের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সচিবালয়সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ), বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত বিলগুলো উত্থাপন করা হলেও সেগুলো নিয়ে বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের আপত্তি ছিল। সংসদেও এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। আইনমন্ত্রী জানান, এসব বিলে বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে এবং এগুলো পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনার জন্য তোলা হবে।
এদিকে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল–২০২৬ সংসদে উত্থাপন করা হলেও এতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। পূর্বের অধ্যাদেশে তিন বা ততোধিক ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের কথা থাকলেও নতুন বিলে সেই বিধান রাখা হয়নি।
বিলে ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন, জলাধার ভরাট, পাহাড় কাটা, কৃষিভূমিতে শিল্প বা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এছাড়া বিল অনুযায়ী, ভূমি জোনিংয়ের ভিত্তিতে কৃষিজমি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং বিশেষ কৃষি অঞ্চলে জমির ব্যবহার পরিবর্তন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। জাতীয় স্বার্থে বিশেষ প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে কৃষিজমি অন্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অপরদিকে, ভোটার তালিকা (সংশোধন) বিল উত্থাপনের সময় সংসদ সদস্যদের যথাসময়ে বিলের কপি না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলেন বিরোধী দলের সদস্যরা। জবাবে স্পিকার জানান, নিয়ম অনুযায়ী তিন দিন আগে কপি দেওয়ার বিধান থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তার ব্যত্যয় ঘটতে পারে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পাস করতে হবে। এ কারণে সময়ের স্বল্পতায় সব বিলের কপি আগে সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি এবং এজন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দ্রুত আইন প্রণয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সংসদের অধিবেশন দিনে দুই দফায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।







