চলতি বোরো মৌসুমে দুর্যোগ মোকাবিলায় হাওরাঞ্চলের কৃষক, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত আগাম প্রস্তুতি ছিল না। ফলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে ধান কাটাকে কেন্দ্র করে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে যন্ত্রনির্ভরতার অতিরিক্ত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ মৌসুমে হাওরাঞ্চলে দৈনিক দুই মণ ধান মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার চড়া মজুরিতে শ্রমিক মিললেও প্রত্যাশিত পরিমাণ ধান কাটতে পারছেন না তারা। এতে কৃষকরা একদিকে শ্রমিক সংকটে, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয়ের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ ধান পানিতেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, দ্রুত ধান কাটার জন্য হাওরাঞ্চলে হারভেস্টার ও রিপার মেশিন পাঠানো হয়েছিল। তবে কয়েকটি এলাকায় পানি বেড়ে যাওয়ায় এসব যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিএই’র উপ-পরিচালক (মনিটরিং) মো. আবু জাফর আল মুনছুর আমার দেশকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারি সহায়তার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সময়মতো ধান কাটতে না পারায় আরও প্রায় ১০ শতাংশ ফসল ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ইতোমধ্যে বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে কৃষকদের শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু মাঠে এখন তীব্র শ্রমিক সংকট বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকের সঙ্গে সরাসরি সরকারি ও করপোরেট ক্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে।
কিশোরগঞ্জের নিকলীর সোহেল রানা আমার দেশকে বলেন, কৃষি শ্রমিকদের অনেকেই এখন অটোরিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় চলে গেছেন। কারণ কৃষিকাজ শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য হলেও লাভ তুলনামূলক কম। ফলে হাওরে ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিঠামইনের এক কৃষক জানান, আগে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় শ্রমিক পাওয়া গেলেও এখন ১৫০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। একদিনের মজুরি দিতে দুই মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, অথচ একজন শ্রমিক দিনে দুই মণ ধানও কাটতে পারছেন না।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, কয়েক মিনিট অটোরিকশা চালিয়েই ৩০-৪০ টাকা আয় করা যায়। তাই এখন আর কেউ কাদা-পানিতে নেমে ধান কাটতে আগ্রহ দেখায় না।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ কাঁচা ধানের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ধান কাটার মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট ধানের দাম কমিয়ে দেয়, পরে একই ধান বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষি এখন জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কয়েক বছর বড় ধরনের দুর্যোগ না থাকায় প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। শুধু যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে হাওরের সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পানি ঢুকে গেলে মানবশ্রমের বিকল্প থাকে না।
তিনি আরও বলেন, হাওরাঞ্চল থেকে দেশের প্রায় ১০ শতাংশ ধান উৎপাদিত হয়। জাতীয়ভাবে বড় সংকট তৈরি না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে তারা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবেন না।







