আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৬ মে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর পেরিয়ে গেছে ৫০ বছর। তবে অর্ধশতক পরও এর নেতিবাচক প্রভাব বহন করছে বাংলাদেশের নদী, কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন চুক্তিতে বাধ্যতামূলক ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ সংযোজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকট, কৃষি বিপর্যয় ও পরিবেশগত ক্ষতি আরও তীব্র হবে।
রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা হয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একসময় নদীর প্রবাহ ছিল জীবন ও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। পদ্মা শুধু একটি নদী নয়, বরং কৃষি, মৎস্য, নৌ-বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবনের প্রাণরেখা ছিল। কিন্তু গত পাঁচ দশকে সেই পদ্মার বুকজুড়ে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর। কোথাও হাঁটুপানিতে নৌকা আটকে যাচ্ছে, কোথাও শত বছরের খাল ও শাখানদী শুকিয়ে গেছে। নদীকেন্দ্রিক হাজারো মানুষের জীবিকা বিলীন হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ১৯৬২ সালে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু হয়। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য হুগলি নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করে ভারত। প্রায় ৭ হাজার ৫৫৯ ফুট দীর্ঘ ব্যারাজটির নির্মাণ শেষ হয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে।
বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল, মাত্র ৪০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা আজও বহাল রয়েছে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারত পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার নামে স্থায়ী পানি প্রত্যাহার শুরু করে।
পদ্মার পরিবর্তিত চিত্র
এক সময়ের প্রমত্ত পদ্মা এখন অনেক স্থানে মৃতপ্রায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা পয়েন্ট থেকে ঈশ্বরদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মাইল এলাকায় নদী খালে পরিণত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বছরের কয়েক মাস ছাড়া নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না।
রাজশাহীর তালাইমারীর বাসিন্দা মোসলেম আলী জানান, আগে উত্তাল পদ্মায় বড় বড় ঢেউ উঠত, প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন সেই নদীতে নৌকা চলে না; চলে গরু-মহিষ ও যানবাহন। যেখানে একসময় মাছ ধরতেন, এখন সেখানে শিশুরা ফুটবল খেলে।
চারঘাটের ইদ্রিস আলী বলেন, “পদ্মায় এখন পানি নেই, মাছও নেই। ভারতের বাঁধের কারণে আমরা জেলেরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।”
ছয় কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে
নদী গবেষকদের মতে, ফারাক্কার প্রভাবে দেশের অন্তত ছয় কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষ পানির সংকটে ভুগছেন। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও পরিবেশে গভীর প্রভাব পড়েছে।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পে পানির ঘাটতির কারণে প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বহু গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও বাড়ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের পর গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ অকার্যকর হয়ে গেছে। বড়াল, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কপোতাক্ষ, চিত্রাসহ বহু নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিপুল
পানিসম্পদ ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সূত্রগুলো বলছে, কৃষি উৎপাদন হ্রাস, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, নৌপথ বন্ধ, পরিবেশ বিপর্যয় ও পানি সংকট মিলিয়ে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
উত্তরাঞ্চলে সেচনির্ভর কৃষির ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার নতুন সংকট তৈরি করছে। মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় বহু দেশীয় প্রজাতি হারিয়ে গেছে। হাজার হাজার জেলে বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পদ্মার পানিপ্রবাহ কমেছে ৮০ শতাংশ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালের আগে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা দিয়ে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কিউসেকে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে যায়।
ফারাক্কার প্রভাবে দেশের প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং সুন্দরবনের ১৭ শতাংশ এলাকায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে।
জেলেদের আয় কমেছে ৭০ শতাংশ
নদী গবেষকদের মতে, পদ্মার ইলিশ প্রায় বিলুপ্ত। বোয়াল, আইড় ও গজালের মতো বড় মাছ এখন খুবই দুর্লভ। নদীর ডলফিন ও ঘড়িয়ালও বিলুপ্তির পথে।
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও কুষ্টিয়ার জেলেপল্লিতে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে জেলেদের আয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। আগে যেখানে একজন জেলে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকার মাছ ধরতে পারতেন, এখন তা কমে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমেছে।
নতুন চুক্তির দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিতে অবশ্যই বাধ্যতামূলক গ্যারান্টি ক্লজ থাকতে হবে। তাদের প্রস্তাব, শুষ্ক মৌসুমে কমপক্ষে ৩৫ হাজার কিউসেক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের রাজশাহী শাখার সভাপতি অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, ২০২৬ সালের আগেই শক্তিশালী কমিটি গঠন করে বিদ্যমান চুক্তি মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফারাক্কার কারণে কৃষি, মৎস্য, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথাও উঠেছে।
ফারাক্কা দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি
ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে রাজশাহীতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সাহেব বাজারে মানববন্ধন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার, পদ্মা নদী নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়া মওলানা ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেবেন।







