গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন। তবে সরকার আপাতত বাহিনীটি বিলুপ্ত করার পথে না গিয়ে মানবাধিকারসম্মত ও পেশাদার কাঠামোয় পুনর্গঠনের চিন্তা করছে। যদিও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও কার্যক্রম এখনো স্পষ্ট নয়।
সোমবার র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবাধিকার রক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনে সরকার কাজ করছে। তবে র্যাবে কী ধরনের সংস্কার আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, দেশে সংঘটিত মোট গুমের প্রায় ২৫ শতাংশ ঘটনায় র্যাবের সম্পৃক্ততা ছিল, যা একক বাহিনী হিসেবে সর্বোচ্চ। কমিশনের অনুসন্ধানে পাওয়া ৪০টি গোপন বন্দিশালার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টি ছিল র্যাবের নিয়ন্ত্রণে।
এ ছাড়া পুলিশের বিশেষ শাখার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে সংঘটিত ১ হাজার ৭টি ‘ক্রসফায়ার’ ঘটনায় নিহত হন ১ হাজার ২৯৩ জন। এর মধ্যে ২৯৩টি ঘটনায় র্যাবের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় গত দুই দশকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। দেশি–বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণেও এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে র্যাবের নাম। এ প্রেক্ষাপটে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গুম তদন্ত কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। একই সঙ্গে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সংস্থাটি বিলুপ্ত করার দাবি জানায়।
এর আগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে র্যাব বিলুপ্তির দাবি তোলে। যদিও ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারই সেনাবাহিনী, পুলিশ, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসারের সদস্যদের সমন্বয়ে এই বাহিনী গঠন করেছিল।
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযানের মাধ্যমে র্যাব আলোচনায় আসে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, ব্যক্তিগত বিরোধ ও প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে।
২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনা র্যাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি। ওই ঘটনায় র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ ১১ সদস্য জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণিত হয়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চায় র্যাব। তৎকালীন মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, র্যাবের হাতে নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর কাছে তারা দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালার অস্তিত্বের কথাও স্বীকার করেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, র্যাব পুরোপুরি বিলুপ্ত না করলেও এর বর্তমান কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব বেসামরিক বাহিনীর হাতে থাকা উচিত। তাই বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশের মধ্য থেকেই দক্ষ ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তাই সংস্কার করতে হলে বাহিনীর জবাবদিহি, আইনি সীমা ও মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় র্যাব পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ) করার সুপারিশ করে। র্যাবের পোশাক ও কার্যক্রমেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
এদিকে, র্যাবের কার্যক্রমও আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে। বড় ধরনের অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও জলদস্যু দমন কার্যক্রমে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে। বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নতুন করে কোনো বিতর্ক এড়াতেই এখন তারা সীমিত পরিসরে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় র্যাবের বলপ্রয়োগ ও গ্রেপ্তারের বিষয় তুলে ধরে বাহিনীটি বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, র্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের অবস্থান দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাহিনীটি বহাল রাখা হলে কী ধরনের সংস্কার হবে, কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে এবং মানবাধিকার সুরক্ষা কীভাবে কার্যকর হবে, এসব বিষয়ে পরিষ্কার রূপরেখা না এলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।







