যেকোনো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং খাত। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সামগ্রিক আর্থিক খাতের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দলীয় সংকীর্ণতার কারণে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা দেশের আর্থিক খাতে অন্যায় হস্তক্ষেপ ঘটে, তবে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদের ওপর ব্যাংক খাতের ওপর আমানতকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা নির্ভর করে। অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তখন আর্থিক খাতের সংস্কার ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি মব বা উশৃঙ্খল জনতাকে ব্যবহার করে তাকে জোরপূর্বক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এভাবে অপসারণ করার ঘটনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
ড. মনসুরের অপসারণের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি অতি সংবেদনশীল ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি শুধু ক্ষমতাসীন দলের সরাসরি অনুসারীই নন, বরং একজন চিহ্নিত ঋণখেলাপি। ব্যাংকিং নিয়মানুযায়ী যেখানে একজন সাধারণ ঋণখেলাপি কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা হারান, সেখানে একজন বড় ঋণখেলাপিকে পুরো দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক বা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া চরম অনৈতিক এবং আইনি কাঠামোর পরিপন্থী। এই নিয়োগের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
দেশের অর্থনীতি যখন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণের শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু নতুন গভর্নর ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় আইএমএফ-এর শর্তসমূহ অপূরণীয় থেকে যায়। দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ কেবল কিছু বাড়তি টাকা নয় বরং এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘সার্টিফিকেট’ বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো কাজ করে। যখন আইএমএফ অর্থ ছাড় স্থগিত করে, তখন বিশ্বব্যাংক বা এডিবির (ADB) মতো অন্যান্য সংস্থাও সতর্ক হয়ে যায়।
ক। রাজস্বখাত সংস্কারে ব্যর্থতা (Failure in Tax/Revenue Reform)
আইএমএফ-এর অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও (Tax-to-GDP Ratio) বা কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করা, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল কর জালের সম্প্রসারণ এবং এনবিআর (NBR)-এর অটোমেশন বা আধুনিকায়ন। কিন্তু নতুন গভর্নর ও সরকার এই সংস্কারে হাত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের আয় বাড়েনি এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে হয় টাকা ছাপাতে হচ্ছে, না হয় চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।
খ। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার না করা (Lack of Structural Banking Reforms)
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ (NPL) কমিয়ে আনা, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সঠিক নীতিমালা তৈরি এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার শর্ত দিয়েছিল আইএমএফ। কিন্তু সংস্কারের পরিবর্তে নতুন গভর্নর নিজেই একজন ঋণখেলাপি হওয়ায় এবং ব্যাংকের শীর্ষ পদে দলীয় লোক বসানোর ফলে আইএমএফ-এর ব্যাংকিং সংস্কার এজেন্ডা সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়।
গ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার না করা (Failure to Withdraw Subsidies)
আইএমএফ-এর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ভর্তুকিমুক্ত করে বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, যাতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমে। সরকার এখানে একটি ‘উভয়সংকট’ বা পলিসি প্যারালাইসিসে পড়েছে—ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়ে, আর ভর্তুকি বজায় রাখলে আইএমএফ-এর শর্ত ভঙ্গ হয়। সরকার কার্যকর কোনো মধ্যপন্থা বা বিকল্প বের করতে না পারায় শর্তটি অপূরণীয় থেকে গেছে।
ঘ। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করতে না পারা (Failure in Market-based Exchange Rate)
ডলারের দাম কৃত্রিমভাবে ধরে না রেখে সম্পূর্ণ বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্ত ছিল আইএমএফ-এর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই এখানে হস্তক্ষেপ করে ডলারের দর বেঁধে দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, তখনই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হুন্ডি চ্যানেলে চলে গেছে। বৈধ পথে ডলার আসা কমে যাওয়ায় এই শর্ত পূরণে ব্যর্থতা অর্থনীতিকে আরও বড় ধাক্কা দিয়েছে।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বৃহত্তম শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-এর ওপর আঘাত আসে। কোনো যৌক্তিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ এবং রেমিট্যান্স আহরণে নেতৃত্ব দেওয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় এমন জোরপূর্বক পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতের ভেতরে তীব্র আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
আর্থিক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে একীভূত হওয়া ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংক থেকে তুলতে পারছে না। নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে গ্রাহকরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাংকের সামনে গ্রাহকদের এই বিক্ষোভ ও হাহাকার দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ব্যাংকিং খাতে এস আলম গ্রুপের মতো লুটেরা চক্রের পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ফলে গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংক থেকে একযোগে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নিতে শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। একটি ব্যাংকের জন্য এত বিপুল পরিমাণ লিকুইডিটি বা তারল্য একবারে চলে যাওয়া ব্যাংকটিকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে লুটপাট ও বিদেশে পাচার করার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর (যেমন: এস আলম গ্রুপ) নাম বারবার সামনে এসেছে। নতুন গভর্নরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক এই চিহ্নিত লুটেরা ও ঋণখেলাপিদের হাতে পুনরায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকানা হস্তান্তরের অপচেষ্টা চালায়। এমনকি পূর্বে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক নিয়মবহির্ভূত ও অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংকিং খাতে পুনরায় পুনর্বহাল ও নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপর মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়।
ব্যাংকিং খাতের এই চরম অরাজকতা ও তারল্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার ও টাকার সংকটের কারণে দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এলসি (লেটার অফ ক্রেডিট) খুলতে না পারায় একদিকে যেমন কলকারখানার কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।
মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়া ও দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া অবস্থা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং বেদনাদায়ক রূপ। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কস্ট-অফ-লিভিং ক্রাইসিস’ (Cost-of-Living Crisis), যা সরাসরি সাধারণ মানুষের হাড়গোড় ভেঙে দেয়। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় পণ্য বা কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি (LC) খুলতে পারছেন না। বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। গ্যাস, ডিজেল এবং এলপিজির দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ভাড়া একলাফে অনেক বেড়ে গেছে। খেত থেকে একটি সবজি ট্রাকে করে বাজারে আনা বা ফ্যাক্টরিতে পণ্য উৎপাদন করা সবখানেই খরচ বাড়ায় চূড়ান্ত ভোক্তাকে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেট ও সুশাসনের অভাব: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা এবং সরকারের নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটছে।
“আয় বাড়েনি এক পয়সাও, কিন্তু খরচের খাতা দ্বিগুণ।” মুদ্রাস্ফীতি যখন দুই অঙ্কের ঘরে (Double-digit) পৌঁছায়, তখন মানুষের জমানো টাকার মান কমে যায়। গত বছর যে টাকা দিয়ে পুরো মাসের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে ১৫ দিন চলাও দায়। দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া অবস্থার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তাদের খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, মাংস, ডিম বা দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। যখন মানুষ তার মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) মেটাতে হিমশিম খায়, তখন সমাজে অপরাধ প্রবণতা, হতাশা এবং সরকারের প্রতি ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে।
একটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে আর্থিক খাতের সুশাসন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক স্বার্থে এবং দলীয় ও ঋণখেলাপি ব্যক্তি মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর করার মাধ্যমে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শীর্ষ ব্যাংকগুলোর আমানত শূন্য হওয়া, লুটেরা গোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা দেশের জাতীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকিং খাতকে অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং যোগ্য ও স্বাধীন পেশাদারদের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।







