যে সমাজে শিশু নিরাপদ নয়, সেই সমাজ নিজেকে সভ্য দাবি করতে পারে না। যে সমাজে শিশুর বিকাশকে আইনি বা বেআইনি পথে থামিয়ে দেওয়া হয়, সেই সমাজও নিজেকে ভদ্রসমাজ বলে চিন্তা করতে পারে না। গণতান্ত্রিক তো নয়ই।
শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ বলে আমরা গালভরা বুলি আওড়াই, কিন্তু তার বিকাশের পথের বাধাগুলো চিহ্নিত করে দূর করার চেষ্টা করি না। শিশুর চাওয়াকে গুরুত্ব দিই না। বরং তার ওপর নানা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিই। অথচ তার নিরাপত্তার জন্য ন্যূনতম যে কর্তব্যবোধ, সেটা পালন করি না। আমরা সবাই মিলে এমন সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে শিশুরাই সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের ফুটফুটে শিশুটি তাদেরই পাশের ফ্ল্যাটের এক দুর্বৃত্তের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব যখন সমাজে অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাজিত হয়। যখন মানুষ নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবে, তখন তারা দুর্বৃত্তে পরিণত হয়। সমাজের বৃহত্তর অংশও সেটাও মেনে নেয়। অপরাধীদের নিশ্বাস ঘাড়ের ওপর এসে যতক্ষণ না পড়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সজাগ হই না। ভাবি, আমার ঘরে আমার সন্তান তো নিরাপদ আছে। এভাবেই একটি সমাজ অপরাধীদের চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বিচারপ্রক্রিয়া এত জটিল, এত ব্যয়সাপেক্ষ যে সব ভুক্তভোগীর পক্ষে আইনি লড়াই চালানো সম্ভব নয়। আর ভুক্তভোগী নারী বা শিশু হলে তো কথাই নেই। এ কারণেই পল্লবীর নিহত শিশুর বাবা আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘তিনি কন্যা হত্যার বিচার চান না। কেননা তিনি জানেন বিচার পাবেন না। বিচার পাওয়ার রেকর্ড নেই।’ একজন বাবা কতটা অসহায় হলে এ ধরনের উক্তি করতে পারেন?
এর মাধ্যমে তিনি সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা গোটা সমাজের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুটির বাসায় গিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও। এখন তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
কেবল পল্লবীর ওই শিশুটি নয়। সাম্প্রতিক কালে অনেকগুলো শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। যেদিন পল্লবীতে শিশুটি ধর্ষিত ও নিহত হয়, তার পরদিনই চট্টগ্রামে চার বছরের আরেকটি শিশুকে হত্যা ও ধর্ষণ করা হয়। সেখানে পুলিশ যখন অপরাধীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে সংঘর্ষও হয়। এর পরদিন শুক্রবার চট্টগ্রামে আরেকটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষ আইন–আদালতের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। তাঁরা মনে করেছেন, আসামি পুলিশের হাতে গেলে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসবে। অতীতে এ রকম ঘটনা এন্তার ঘটেছে। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে কোনোভাবে সমর্থন করি না। কিন্তু ক্ষুব্ধ মানুষ কখন এই পথ বেছে নেয়, সেটাও সরকারকে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর আইন আছে। কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। বিশেষ করে ভুক্তভোগী যদি দুর্বল ও অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সবল হন, সেখানে বিচার পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ১১৫টি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে নির্যাতন করে। ১২টিকে হত্যা করা হয়েছে ধর্ষণের পর। এর বাইরে ২০টি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সংগঠনটি এই তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে। কিন্তু সব শিশু হত্যার খবর যেমন সংবাদমাধ্যমে আসে না, তেমনি থানা-পুলিশে মামলাও হয় না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের উদ্যোগে করা গবেষণায় যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা ভয়াবহ। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় শাস্তির হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে শেষ হতে সময় লাগে গড়ে তিন বছর সাত মাস।
আশার কথা, পল্লবীর শিশুটি হত্যার পর সারা দেশে মানুষ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছেন। তাঁরা অবিলম্বে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার দাবি করেছেন। মানুষের এই সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, সেই ভরসা কম।
বাংলাদেশে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে অতীতেও বহু প্রতিবাদ হয়েছে। মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। খুনি ও ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে আইনজীবীরা শপথও নিয়েছেন। কিন্তু তারপরও নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যার বিচারকাজ শেষ করা যায়নি। চট্টগ্রামে মিতু হত্যা মামলাও ঝুলে আছে। কুমিল্লার তনু হত্যার বিচারও থমকে ছিল ১০ বছর। অতি সম্প্রতি মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা নিয়েও জলঘোলা হয়েছে অনেক। আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত এই জোড়া খুনের কিনারা করতে পারেনি কোনো সরকার। তদন্ত কর্মকর্তারা কেবল সময় বাড়িয়ে চলেছেন। আমাদের বিচারব্যবস্থা কত ভঙ্গুর, এই মামলাটিই তার প্রমাণ। অনেকে সন্দেহ করেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ এই হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে হত্যারহস্য বের করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসেও কোনো অগ্রগতি হলো না কেন?
কেবল কন্যাশিশু ধর্ষণ নয়, ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মাদ্রাসায়। গত কয়েক দিনে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, অভিযুক্ত গ্রেপ্তারও হয়েছে। এই যে সামাজিক অনাচার ও অপরাধ; শুধু আইন প্রয়োগ করে এর প্রতিকার পাওয়া যাবে না। আইন তো প্রয়োগ করতেই হবে। একই সঙ্গে যারা শিশু ও নারী ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক জাগরণ তৈরি করা জরুরি। সমাজে শুভ শক্তির জাগরণ দিয়েই অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। আমাদের চারপাশে যে অপরাধীরা লুকিয়ে আছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনাই হবে সভ্য নাগরিক ও সভ্য সমাজের দায়িত্ব।
পল্লবীর শিশুটির বাবা সেখানকার পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, নোংরা পরিবেশের কারণেই তার মেয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। সরকারপ্রধানের উচিত হবে যারা এ রকম নোংরা পরিবেশ তৈরি করে সমাজকে কলুষিত করছে, শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া। এমনভাবে সারা দেশের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পল্লবীর ওই শিশুর বাবা-মায়ের মতো কারও সন্তান এভাবে নৃশংসতার শিকার হবে না। শিশুর জন্য আমরা সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।
সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি







