২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমাতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলির নির্দেশ দেওয়া বিতর্কিত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। যাদের বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল, তারা উল্টো খোলস বদলে বর্তমান সরকারের আমলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নীতিনির্ধারণী ও প্রভাবশালী পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সূত্র থেকে প্রাপ্ত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তালিকা এবং তাদের বর্তমান পদায়ন বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ হাসিনার পতনের আগে জুলাইয়ের ক্র্যাকডাউন সফল করতে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত বা তৎকালীন সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছিল। সরকার পতনের পর তাদের অনেকেই রাতারাতি ভোল পাল্টে প্রভাবশালী পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ার বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ হিসেবে বহাল আছেন। এছাড়া ২০ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত রামপুরাসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব নিকারুজ্জামানের পরিবার সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে ‘রাতের ভোটে’ সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। একই বিভাগের দুই সিনিয়র সহকারী সচিব এস এম মুনিম লিংকন ও মো. আক্তারুজ্জামানও জুলাই-আগস্টে মাঠে সক্রিয় ছিলেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাখাতেও এই তালিকার একাধিক কর্মকর্তা বহাল আছেন। আন্দোলনের সময় ঢাকা ডিসি অফিসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থাকা মোছা. আকলিমা বেগমকে ৫ আগস্টের পর কৌশলগত কারণে বদলি করা হলেও সম্প্রতি তাকে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া ৪ আগস্ট হানিফ ফ্লাইওভার ও শনির আখড়ার মতো তীব্র সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করা দুই উপসচিব মইন উদ্দিন ইকবাল ও আলমগীর কবীর বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েই কর্মরত আছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে পদায়িত সায়েম ইমরানকে নিয়ে। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় নির্বিচারে ২৭৯ রাউন্ড গুলি চালানোর নির্দেশ দাতা ঢাকা ডিসি অফিসের এই বিতর্কিত সহকারী কমিশনার বর্তমানে আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ভোল বদলে বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সচিবালয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
নীতিনির্ধারণী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন তিনজন বিতর্কিত কর্মকর্তা—উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ, উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ এবং খন্দকার রবিউল ইসলাম, যারা জুলাই-আগস্টে রামপুরা, বাড্ডাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন পদায়ন হওয়া বাণিজ্য সচিবের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ শামসুল আরেফিন, যিনি ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি চত্বর এবং রামপুরা এলাকায় গুলির নির্দেশদাতার দায়িত্বে ছিলেন। একই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসান। অর্থ বিভাগেও পুনর্বাসিত হয়েছেন তালিকায় থাকা তিন কর্মকর্তা—সৈয়দ আশরাফুজ্জামান, দেবাংশু কুমার সিংহ এবং উপসচিব মাসুদ রানা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মোট ৫১ জন কর্মকর্তা সরাসরি মাঠে নিয়োজিত ছিলেন। সরকার পতনের পর তাদের অনেককেই ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও এখনো তারা ঢাকা ও আশেপাশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পদে (ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড) বহাল আছেন। এদের মধ্যে আশুগঞ্জ, মানিকগঞ্জ সদর, কেরানীগঞ্জ ও শিবালয়ে ইউএনও হিসেবে এবং নারায়ণগঞ্জ সদর, নবাবগঞ্জ ও শিবচরে এসিল্যান্ড হিসেবে বিতর্কিত কর্মকর্তারা কর্মরত আছেন।
বিচারের পরিবর্তে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের এমন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা আন্দোলনকারী ও তাদের স্বজনরা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, ‘জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের যারা গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে ভালো পদে বসানো খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। সরকারকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় এমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাবে।’







