যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে চলমান টালমাটাল পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই থামছে না। বিগত চার বছরে মোট পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলের মধ্য দিয়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট।
কিয়ার স্টারমারের নাটকীয় পদত্যাগের পর সোমবার (২০ জুলাই) ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির অভিজ্ঞ নেতা এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বাকিংহাম প্যালেসে রাজা চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের সবুজ সংকেত পান তিনি। দায়িত্ব নিয়েই বার্নহাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর সরকার দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় পরিবর্তন আনবে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—তিনি কি তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন, নাকি পূর্বসূরিদের মতোই মাঝপথে বিদায় নিতে হবে?
ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে একের পর এক সরকার পরিবর্তন দেখেছে যুক্তরাজ্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র এক দশকের মধ্যে বার্নহাম ব্রিটেনের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং সর্বশেষ কিয়ার স্টারমারের পর বার্নহামের এই অভিষেককে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। যেখানে কিয়ার স্টারমার মাত্র দুই বছর টিকে থাকতে পেরেছেন, সেখানে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে চ্যালেঞ্জটা পাহাড়সম।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস’ (সিএফআর)-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বার্নহামের ডাউনিং স্ট্রিটে আগমন লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বে একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। তিনি মূলত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক পুনর্গঠনের নীতিতে বিশ্বাসী। তবে তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নির্ভর করবে নিজ মন্ত্রিসভা এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন তাঁর ওপর। ব্রিটেনের সংসদীয় নীতি অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দল নেতা পরিবর্তন করতে পারায় দলের ভেতরে সামান্য অসন্তোষ দেখা দিলেই প্রধানমন্ত্রীর আসন নড়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্নহামের দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর অভিজ্ঞতা সীমিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটে ব্রিটেনের অবস্থান শক্ত রাখা তাঁর জন্য বড় অগ্নিপরীক্ষা হবে। যদিও প্রায় এক দশক ধরে ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁকে শাসনকাজে অনেকটাই পরিপক্ব করেছে।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র মতে, লেবার পার্টির ৪০১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭৯ জনের সমর্থন নিয়ে বার্নহাম ক্ষমতায় এসেছেন, যা তাঁর প্রাথমিক ভিত্তি শক্তিশালী করে। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর যে জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা তাঁকে বড় সুবিধা দেবে। অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর কাঠামোতে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে এবং দলের ভেতরের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারলে বার্নহামের পক্ষে আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত টিকে থাকা অসম্ভব নয়।
অ্যান্ডি বার্নহাম এমন এক সংকটময় সময়ে ব্রিটেনের হাল ধরলেন, যখন বারবার সরকার পরিবর্তনে দেশটির নাগরিকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা বন্ধ করে তিনি যদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবেই ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটি নতুন ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা হবে।







