রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এখন আগের মতোই কর্মচঞ্চল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে ছুটে চলছে যানবাহন, ফুটপাতে ফিরেছে স্বাভাবিক ছন্দ। তবে এই ব্যস্ততার আড়ালে এখনো লুকিয়ে আছে গত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি। দেওয়ালে গুলির দাগ ও স্মৃতিফলকে খোদাই করা কয়েকশ নাম আজও বহন করছে রক্তক্ষয়ী সেই দিনগুলোর পরিচয়। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের কাছে এই যাত্রাবাড়ী পরিচিতি পেয়েছে ‘জুলাই বিপ্লবের স্ট্যালিনগ্রাদ’ হিসেবে।
চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী মহাসড়ক এবং বন্দরের পণ্যবাহী পরিবহনের প্রধান প্রবেশপথ হওয়ায় যাত্রাবাড়ী ছিল অত্যন্ত কৌশলগত একটি স্থান। আন্দোলনকারীদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই মোড়কে অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের সংগঠন জুলাই বিপ্লব পরিষদের নেতারা ১৭ জুলাইকে ‘যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের মতে, সেদিন থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধ না হলে গণঅভ্যুত্থানের গতি এত দ্রুত বৃদ্ধি পেত না।
শিক্ষার্থীদের হাত ধরে আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত তা সাধারণ মানুষের মিছিলে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দিনমজুর, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষকরাও রাজপথে নেমে আসেন। এলাকাবাসী আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়, পানি ও খাবার জুগিয়ে কিংবা আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানান।
সংঘর্ষের সময় মহাসড়কে বাস-ট্রাক আড়াআড়ি রেখে এবং ইট-বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। মূল সড়কের সঙ্গে অসংখ্য গলি ও উপগলি থাকায় সংঘর্ষের সময় আন্দোলনকারীরা দ্রুত পিছু হটতে পারতেন এবং সুযোগ বুঝে আবার মূল সড়কে ফিরে এসে অবস্থান নিতেন। ফলে বারবার অভিযান চালিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।
৫ আগস্ট সকালে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে অনেক আন্দোলনকারী জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামেন। তেমনই একজন হাফেজ মোহাম্মদ হোসাইন আহমেদ, যিনি গুলিতে মারাত্মক আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত ডান হাতটি হারান। অন্যদিকে, কুতুবখালী বড় মাদরাসার শিক্ষার্থী শহীদ দীন ইসলাম বেপারীর মতো অনেকের পরিবার আজও প্রিয়জনকে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের একমাত্র দাবি—এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার।
আজ যাত্রাবাড়ীর রাস্তায় ব্যারিকেড বা ধোঁয়া নেই, তবে অলিগলির দেওয়াল ও স্মৃতিফলকগুলো সেই ভয়াল সময় আর ত্যাগের সাক্ষ্য দিচ্ছে। পুরো দেশের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের বহুমুখী মাত্রা থাকলেও যাত্রাবাড়ীর অধিবাসীদের কাছে এই স্থানটি প্রতিরোধ, বেদনা ও ত্যাগের এক অবিচ্ছেদ্য স্মারক।







