স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং চলতি মাসের মধ্যেই বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন। এর আগে হৃদরোগের চিকিৎসা ও বাইপাস সার্জারির জন্যও তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
বঙ্গভবনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কথা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠজনদের অবহিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে সরকারের তিনজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং বিদ্যমান সংসদ কার্যকর থাকায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
শারীরিক অবস্থার অবনতি
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে উদ্বেগজনক। সম্প্রতি তিনি দুবার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। তার সিটি স্ক্যান ও এমআরআই রিপোর্টে জটিলতা ধরা পড়ে। হৃদরোগজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি নিউরোলজিক্যাল সমস্যাও শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পরিবারও এ মুহূর্তে তার চিকিৎসাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে মেডিকেল চেকআপ করিয়ে ফিরেছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া সমীচীন হবে না বিবেচনা করে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চলতি মাসেই তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করবেন।
পদত্যাগের দাবি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি ওঠে। সে সময় আন্দোলনকারীরা একাধিকবার বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারেরও তাকে অপসারণে আগ্রহ ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল।
তবে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সম্ভাব্য সাংবিধানিক জটিলতার আশঙ্কায় বিষয়টি আর এগোয়নি। যদিও সে সময় রাষ্ট্রপতিকে কার্যত সীমিত পরিসরে রাখা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
পরে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে ‘সেফ এক্সিট’ এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতির পদে কে থাকবেন—এ ধরনের বিষয় সামনে আসায় সিদ্ধান্ত আর চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য আরও এক বছরের সময় দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয় বলে জানা যায়। একই সময়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে নতুন কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়।
সরকারের সঙ্গে দূরত্ব
লন্ডন সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযোগ ওঠে, সফরকালে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
পরবর্তীতে সরকার ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে পড়ে। এমনকি গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থবিল স্বাক্ষর ও বাজেট অধিবেশনে অংশ নিতে গেলে সরকারের কোনো জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বলেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
সূত্রের ভাষ্য, সরকারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব এবং আস্থার সংকটের কারণেই রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি দেখা যেতে পারে বলেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সংবিধান কী বলছে
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি এখন পর্যন্ত প্রায় তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একান্ত আলাপচারিতায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, তিনি সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। তিনি সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিতে চান এবং সরকার যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই বঙ্গভবন ছাড়তে প্রস্তুত রয়েছেন।







