সদ্য পদত্যাগ করা সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাংক খাতের লুটপাট ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নীরব সমর্থনের মতো একাধিক গুরুত অপরাধের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। ইসলামী ব্যাংক দখল, এস আলম গ্রুপকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারে সহায়তা এবং বিদেশে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ার তথ্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ছাড়া বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি শেয়ার কেলেঙ্কারিতে তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানি ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন নির্দিষ্ট দায়মুক্তি বা ইমিউনিটি থাকলেও, দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের অপরাধের বিচার সম্ভব কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। টিআইবিসহ বিভিন্ন সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুদক কমিশনার, ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান কিংবা অন্য কোনো পদে কর্মরত থাকার সময় সংঘটিত দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় সংবিধানের ওই দায়মুক্তি কোনো বাধা হতে পারে না। তবে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বর্তমান বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালনকালে সাহাবুদ্দিন ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারী ধামাচাপা দেওয়া এবং বেসিক ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকা হরিলুটের মাস্টারমাইন্ডদের বাঁচিয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক ও এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সংস্থায় যুক্ত থেকে নামকাওয়াস্তে কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল শেয়ার জালিয়াতি ও ঋণ বিতরণে সহায়তা করেন, যার বিনিময়ে তিনি দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ সুবিধা গ্রহণ, দুবাইয়ে গোপন ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং দেশের ভেতরে নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলার বিষয়েও এখন নানা তথ্য প্রকাশ্যে আসছে। সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা ও সন্তান আরশাদ আদনানের নামে অস্বাভাবিক সম্পদ ও চলচিত্র নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
এদিকে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির আইনি পরিণতি নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই ভিন্নমত দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাবেক রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ইমিউনিটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অভিযোগগুলোকে আমলযোগ্য নয় বললেও, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যাংক খাত লুটপাটসহ সকল দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন কোনো তদন্ত না হলেও সাহাবুদ্দিনের পুরনো যেসব ব্যাংক কেলেঙ্কারির নথি রয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।







