আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় যেকোনো বড় ধরনের পরিবর্তন কেবল নাম পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং এর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেই আলোতে র্যাব বিলুপ্ত না করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ)’ নামে নতুনভাবে পুনর্গঠন এবং এর কমান্ড স্ট্রাকচারে আনীত পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে কতটা কার্যকর হবে, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়।
বিগত বছরগুলোতে র্যাবের মূল সমস্যা কেবল এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে ছিল না, বরং বাহিনীটির ভেতর গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ও ডি-ফ্যাক্টো কমান্ড স্ট্রাকচারের কারণে এটি মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। অতীতে জেলা বা লোকাল পর্যায়ের কমান্ডার কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বিশেষ ইউনিট (যেমন সিএসসি) ব্যবহার করে নানা বিতর্কিত অপারেশন পরিচালনা করা হতো, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছিল না।
বিএনপি সরকারের নতুন আইনের খসড়ায় কমান্ড স্ট্রাকচার পুনর্গঠন করে এর অপারেশনাল ক্যাপাসিটি সরাসরি সরকার, পুলিশের আইজিপি এবং স্পেশাল ফোর্সের মহাপরিচালকের অধীনে নিয়ে আসার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায় তবে এ ধরনের সমান্তরাল বা ডি-ফ্যাক্টো কমান্ডের সুযোগ অনেকাংশেই বন্ধ হবে। চেইন অব কমান্ড নির্দিষ্ট থাকায় যেকোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক অপব্যবহার ঘটলে সরাসরি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় বর্তাবে, যা জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষপ হতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুম কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ছিল র্যাবে সামরিক কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন বা প্রেষণে নিয়োগ বন্ধ করা। এই প্রস্তাবটি পুরোপুরি উপেক্ষিত হওয়ায় একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, বেসামরিক পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যে সামরিক মানসিকতা ও কৌশলের উপস্থিতি অনেক সময় নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বদলে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। র্যাব বা নতুন নামের এসআরএফ-কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি গণমুখী সংস্থায় পরিণত করতে হলে কেবল কমান্ড স্ট্রাকচারে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়, বরং সামরিক প্রভাব কমানোও অত্যন্ত জরুরি ছিল।
পরিশেষে, কেবল নাম পরিবর্তন বা আইনি সংস্কার কাগজে-কলমে কার্যকর করলেই কোনো বাহিনীর ভাবমূর্তি কিংবা কার্যকারিতা রাতারাতি বদলে যায় না। স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ) কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা কতটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে তার ওপর। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার বন্ধ করা এবং যেকোনো অন্যায় অপারেশনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই হবে এই সংস্কারের মূল সফলতা।







