বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘আমাদের পুরো আন্দোলন ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। অথচ এখন বিএনপিই বৈষম্যের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার রাতে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসের শেষ দিকে ওয়াকআউটের পর তাৎক্ষণিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
সংসদ চত্বরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তাহের অভিযোগ করেন, বিরোধীদলের সঙ্গে বিএনপি সরকার যে আচরণ করছে, অতীতে আওয়ামী লীগও এমন আচরণ করেনি। বিভিন্ন উন্নয়ন তহবিল বিএনপির সংসদ সদস্যদের দেওয়া হলেও বিরোধীদলের এমপিদের তা দেওয়া হচ্ছে না। সংরক্ষিত নারী আসনের বিরোধীদলীয় এমপিরাও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন তিনি। সংসদে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার পর কিছু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে ওয়াকআউট
বৃহস্পতিবারের ওয়াকআউট প্রসঙ্গে তাহের বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দফা ওয়াকআউটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে বিরোধীদল সংসদীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
তিনি বলেন, সর্বশেষ ওয়াকআউটের অন্যতম কারণ গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান। তাহেরের দাবি, গণভোটের পক্ষে বিএনপি ও জামায়াতসহ সবাই অবস্থান নিয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রীও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এখন বলছে, গণভোট সংবিধানকে কভার করে না।
তাহের বলেন, ‘তাহলে নির্বাচনও তো সংবিধান কভার করে না। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সরকারকেও কভার করে না। গণভোট অবৈধ হলে তারাও বৈধ থাকে না। এ ধরনের প্রকাশ্য বৈপরীত্য বিএনপি জাতির সামনে চাপিয়ে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করব না। গণভোট বাস্তবায়নের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের লংমার্চ আছে। বিএনপির বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। এ ধরনের সরকার থাকলে জাতির সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ থাকে না।’
‘দুর্নীতির আগে ১০০ যোগ হয়ে গেছে’
প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করে তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।
তার ভাষায়, ‘জিরো আছে, কিন্তু তার আগে ১০০ যোগ হয়ে গেছে। সেই হারেই দুর্নীতি চলছে।’
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেছেন, বিল উত্থাপনের আগেই গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার করতে হবে। তার মতে, ‘এ ছাড়া আর কোনো পন্থা নেই।’
সরকার বিরোধীদলের দাবি পূরণ না করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিভিন্ন বিল পাসের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তাহের। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিল প্রত্যাখ্যান করেই তারা ওয়াকআউট করেছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো বিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাসের চেষ্টা করা হলে বিরোধীদল তার প্রতিবাদ করবে।
‘জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ওয়াকআউট’
এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, কোনো অজুহাতে নয়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই তারা সংসদ থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিরোধীদলের এমপিদের বক্তব্যকে তিনি ‘শাহবাগের বক্তব্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অথচ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ‘শাহবাগের প্রডাক্ট’ এবং শাহবাগই তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তাহের।
তিনি বলেন, প্রত্যেকের বক্তব্য দেওয়ার ধরন আলাদা। বিরোধীদলও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করতে পারে। তবে একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকেই বিরোধীদলের নেতারা বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের বিষয়ে সতর্ক থাকেন।
তাহের অভিযোগ করেন, সরকারের আচরণে ‘অহমিকা, একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এবং চরম দলীয়করণের মানসিকতা’ প্রকাশ পাচ্ছে।
এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দিনের শুরুতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের কটূক্তি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনসহ বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।







