জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধের বিষয়ে দেওয়া বক্তব্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের প্রশংসা করেছেন তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ও আলেম-ওলামাদের ওপর চাপিয়ে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ নয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর পৌনে ২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে সংসদে দেওয়া হাসনাতের বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ করে। একই সঙ্গে ক্ষমা না চাইলে জেলায় এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ফেসবুক পোস্টে হাসনাত বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা চেয়ে সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতো—এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ও সেখানকার আলেম-ওলামাদের ওপর চাপানো হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের একটি কনসার্ট বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ব্যাখ্যা করেন হাসনাত। তার দাবি, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেন। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে পরিস্থিতির অবনতি হয় এবং পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
তিনি বলেন, ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করেননি; তারা শুধু শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
নৌকাবাইচের প্রসঙ্গে নিজের বক্তব্যে তথ্যগত ভুল হয়েছিল বলেও স্বীকার করেন হাসনাত। তিনি জানান, সিলেটের পরিবর্তে ভুল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন। এ কারণে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
হাসনাত বলেন, সংসদে মূল ঘটনা এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল। তবে সম্পূরক প্রশ্নের সময় সীমিত থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, তিনি ও তার দল জুলাইয়ের আদর্শ ধারণ করেন এবং সেই আদর্শের ভিত্তিতেই নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চান। তার মতে, জুলাই এমন একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত থাকবে এবং কেউ নিজের মত বা দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।
বাংলাদেশে সব ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে হাসনাত বলেন, দেশে মসজিদ, মন্দির, সংগীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসব—সবই থাকবে। যার যে আয়োজন পছন্দ, তিনি তাতে অংশ নেবেন; আর যা পছন্দ নয়, তাতে অংশ নেবেন না। সরকারের দায়িত্ব হবে, কেউ যেন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।
সরকার বর্তমানে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এর ফলে সমতার বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন হাসনাত।
তিনি বলেন, জুলাই ছিল ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবার আন্দোলন। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করে একটি সর্বজনীন সমাজ গড়ে তোলাই ছিল এর লক্ষ্য। সেই বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।







