উপমহাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক দেশভাগের গুরুত্ব হিসেবে সাম্প্রতিক ঈদুল আজহার আবহে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তাহীনতার বিপরীতে বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে দেশভাগের এক অনন্য অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গত ঈদে মুসলমানদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় মাইক হাতে বা গোপনে পশু কোরবানির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অন্যদিকে, কর্ণাটকের ব্যাঙ্গালোরের আদালতের এক রায়ের পর স্থানীয় প্রশাসন পুরো রাজ্যজুড়ে গরু কোরবানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
নিষেধাজ্ঞার বাইরেও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মুসলমানদের নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করে। উগ্রবাদীদের হামলা ও প্রাণনাশের আশঙ্কায় অন্তত ২৯টি রাজ্যের অসংখ্য মুসলমান ঈদের নামাজেও অংশ নিতে পারেননি বলে জানা যায়। ভারতের এই ভয়ার্ত ও অবরুদ্ধ পরিবেশের বিপরীত চিত্রে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতায় উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে।
রাজনৈতিক ও ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিছক কোনো ভূখণ্ডভিত্তিক বিভাজন ছিল না। এর মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্থায়ী স্বাধীন সত্তা ও ভৌগোলিক মানচিত্র অর্জন করেছিল। আজকের বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন, কোরবানির স্বাধীনতা এবং নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় থাকা—এই ৪৭-এর আন্দোলনেরই সুফল।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৪০-এর দশকে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে সাউথ এশিয়ার মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। দেওবন্দের রাজনৈতিক অবস্থান, নব্য খারেজি মওদূদীর মতবাদ, আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী নেতা এবং ভারতপন্থী কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্যামব্রিজের তরুণ চৌধুরী রহমত আলীর ‘পাকিস্তান’ ধারণাকে প্রথমে অনেকেই এক অসম্ভব অলীক কল্পনা বা বার্গেনিং চিপ মনে করেছিল।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ মাত্র ২০ শতাংশ মুসলিম আসনে জয়লাভ করার পর তাদের শাসন ক্ষমতা বা জনসমর্থন নিয়ে প্রবল সংশয় তৈরি হয়। কংগ্রেসের রাজপথের শক্তি, শিল্পপতিদের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিপরীতে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তবে উত্তর প্রদেশ, বিহার, বোম্বে ও মাদ্রাজসহ ভারতের সংখ্যালঘু অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ সমর্থনের ওপর ভর করে এবং কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কৌশলী দরকষাকষির ফলে রাজনীতি নতুন মোড় নেয়।
পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ অধিকাংশ মুসলিম আসনে জয়ী হয়ে সর্বভারতীয় মুসলিমদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে। ব্রিটিশ সরকারের দ্রুত বিদায়ের সিদ্ধান্ত এবং তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জিন্নাহর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ এবং কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের ফলে অবশেষে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে মুসলিমদের স্বাধীন ভূখণ্ড ‘পাকিস্তান’ অর্জিত হয়।
বিশ্লেষকদের অভিমত, জিন্নাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো দূরদর্শী নেতাদের নিরলস রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফসল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। বাপ-দাদার সামান্য ভিটেমাটির মতো অর্জিত এই ভূখণ্ড ও স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা এবং সব ধরনের কুসংস্কার বা অমর্যাদা থেকে একে রক্ষা করতে নতুন প্রজন্মকে সদা সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।







