আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে তালেবানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গত ১৬ই সেপ্টেম্বর সাথে বৈঠক করেছেন তুরস্ক ও কাতারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন এবং কাতারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামাদ বিন খামিস আল কুবাইসি কাবুলে গিয়ে তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, গোয়েন্দাপ্রধান আবদুল হক ওয়াসিক এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদের সাথে পৃথক বৈঠক করেন। আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ, মাদকপাচার এবং ইরান পরিস্থিতি গুরুত্ব পায়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল আফগানিস্তান বা পাকিস্তান সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়। তালেবানকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে তুরস্ক ও কাতার যেভাবে চুক্তি ও সম্পর্কে এগোচ্ছে, একই আদলে সোমালিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আল শাবাব’কেও রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরের চেষ্টা করছে তারা। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো—ইদানিং আল শাবাব এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে অস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের আদান-প্রদান আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সোমালিয়া ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ তৎপরতা আদেন উপসাগর, লোহিত সাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালির সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বাংলাদেশগামী জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, যার ফলে সময় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বাবদ অতিরিক্ত ৬৬ কোটি টাকা গুনতে হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাব আল মান্দেব ও সুয়েজ ক্যানেলনির্ভর অঞ্চলগুলোর সাথে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার—যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭৭ শতাংশই যায় এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল বাজারগুলোতে। অর্থাৎ বাব আল-মান্দেব প্রণালির যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ ও অর্থনীতির ওপর আঘাত হানে। ফলে কাবুলের এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ও আঞ্চলিক সমীকরণকে বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।







