দেশের কৃষি খাতে সারের সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে সীমান্ত ও সমুদ্রপথে ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটছে।
সারের এই সংকট শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সীমান্তপথে সার পাচারের সঙ্গে মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টি কৃষি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভর্তুকির কারণে সারের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা ও উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র সার পাচার করছে।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কর্ণফুলী নদী ও কক্সবাজারের উপকূলীয় বিভিন্ন রুটেও সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে সারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এ চোরাচালান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানেও এর কিছু প্রমাণ মিলেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৫ হাজার কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এ সময় দুজনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সারগুলো নৌপথে মিয়ানমারে পাঠানোর উদ্দেশ্যে সেখানে আনা হয়েছিল বলে আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এর কয়েক দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর সেন্ট মার্টিনের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৪০ বস্তা ইউরিয়া সারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে রসুন ও পেঁয়াজও ছিল।
এর আগে জুলাইয়েও ভাসানচরের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা থেকে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ২৪ হাজার ৫০০ কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ছয়জনকে আটক করে কোস্ট গার্ড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বাংলাদেশে কম দামের সার মিয়ানমারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় পাচারকারীদের কাছে এটি লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে সরবরাহ সংকট থাকায় বাংলাদেশ থেকে সারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের প্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পাচারের সঙ্গে মাদক পাচারেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে সার ও অন্যান্য পণ্য যাওয়ার বিপরীতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ মাদক ঢোকার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সার পাচারের অভিযোগের মধ্যেই কৃষকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও ডিলারের দোকানে দিনের পর দিন ঘুরেও কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন।
এরই একটি চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে। গত ৭ সেপ্টেম্বর সারের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন কয়েক শ কৃষক। তাঁদের অভিযোগ ছিল, চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া হচ্ছিল না এবং পরিচিত বা পছন্দের ব্যক্তিদের বেশি সার দেওয়া হচ্ছিল।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে কৃষকেরা সড়কে বাঁশ ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলে গেলে তাকে অবরুদ্ধ করার অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। পরে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার পর থেকেই স্থানীয় কৃষকদের একটি অংশ গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, রাতে পুলিশি অভিযানের আশঙ্কায় অনেকেই বাড়িতে থাকছেন না। ফলে নিয়মিত কৃষিকাজ, সেচ ও জমির পরিচর্যায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
একজন কৃষকের প্রশ্ন, “সার চাওয়া কি অপরাধ?” কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সার না পেয়ে তারা বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু সেই আন্দোলনের পর মামলায় জড়িয়ে পড়ায় এখন অনেকে মাঠে কাজ করার পাশাপাশি গ্রেপ্তারের আশঙ্কাও করছেন।
তবে পুলিশ বলছে, সাধারণ কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
একইভাবে সার পাচারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বহনকারী বা শ্রমিক পর্যায়ের লোকজন আটক হলেও মূল হোতাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ফলে একই সময়ে দুটি বিপরীত চিত্র সামনে এসেছে—কৃষকের জমিতে যাওয়ার কথা যে ভর্তুকির সার, তার একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ; আর সেই সার না পেয়ে দেশের কৃষককে আন্দোলন করতে হচ্ছে, কোথাও আবার মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তারের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংকট মোকাবিলায় শুধু অতিরিক্ত সার বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার নজরদারি, উপকারভোগী কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো এবং সীমান্তপথে পাচার বন্ধ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কারণ কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার যদি কালোবাজার বা পাচারচক্রের হাতে চলে যায়, তাহলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হবে, অন্যদিকে সীমান্তপথে অবৈধ পণ্যের আদান-প্রদান আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে মাঠের কৃষক ও দেশের খাদ্য উৎপাদনের ওপর।







