ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি মুছে ফেলার কাজ শুরু করেছে হল প্রশাসন। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে সেখানে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম লেখা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হলের প্রধান ফটকে নাম মুছে ফেলার কাজ শুরু হয়। হল প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিভ্রান্তি এড়াতে পুরোনো নামটি পুনর্বহাল করা হচ্ছে।
হলের সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মো. জবান আলী বলেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে মৌখিকভাবে হলের নাম সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছেন। ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামটি পুনরায় লেখা হবে।
বুধবার দুপুরে হলের প্রধান ফটকে গিয়ে দেখা যায়, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা অংশটি মুছে ফেলার কাজ চলছে। নামফলকের পুরোনো লেখা সরিয়ে নতুন করে নাম লেখার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে জানিয়েছে হল প্রশাসন।
যেভাবে পরিবর্তন হয়েছিল হলের নাম
এর আগে ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম মুছে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশের উদ্যোগে ওই নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও শেখ মুজিবুর রহমান হল সংসদের পক্ষ থেকে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসংবলিত একটি স্মারকলিপি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়।
হাদির মৃত্যুর পর তার নামে হলটির নামকরণের বিষয়টি সামনে আসে। ২০ ডিসেম্বর রাতে শিক্ষার্থীদের একাংশ হলের প্রধান ফটকে থাকা ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম মুছে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লিখে দেন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পর্যায়েও আলোচনায় আসে।
সিন্ডিকেট ও সিনেটে নাম পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা
এর ধারাবাহিকতায় গত ৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলসহ শেখ পরিবারের নামে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনেও আলোচনায় আসে। গত ২৯ জুন সিনেট অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দেয়।
সিনেট সদস্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বিষয়টি বিধি অনুসরণ করে পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফাও নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আপত্তি জানান।
অন্যদিকে সিনেট সদস্য ফজলুল হক মিলন ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’-এর নাম পরিবর্তন করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নামকরণের প্রস্তাব দেন। দীর্ঘ আলোচনা হলেও সেদিন এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিষয়টি পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর প্রতিবাদে সিনেট অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন ডাকসুর পাঁচ সিনেট সদস্য—ভিপি সাদেক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ ও সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না।
হল প্রশাসনের বক্তব্য
হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে এ বিষয়ে জানতে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে হলের সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মো. জবান আলী বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে পুরোনো নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ পুনরায় লেখা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও বর্তমানে হলটির নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হলটি ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত।







