স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। তার ভাষ্য, যেসব এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেসব এলাকাতেই পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সারের সংকট দেখানো হয়েছে। বিপরীতে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন—এমন এলাকায় সারের সংকট কিংবা এ নিয়ে আন্দোলন হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
২৯ সেপ্টেম্বর রংপুরে এবং পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন মীর শাহে আলম। কুড়িগ্রামে তিনি একটি মানচিত্রও প্রদর্শন করেন। সেখানে কুড়িগ্রাম, রংপুর, নড়াইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাকে লাল রঙে চিহ্নিত করে সারের সংকটপূর্ণ এলাকা হিসেবে দেখানো হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, কুমিল্লা, সিলেট ও বরিশাল জেলায় সারের সংকট হয়নি। তার দাবি, মাত্র ১০ থেকে ১১টি জেলায় সংকটের কথা বলা হচ্ছে এবং এসব জায়গায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।
তবে বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন যাচাই করে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করছেন—এমন একাধিক আসনে সার না পাওয়া, চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ, বেশি দামে সার বিক্রি এবং কৃষকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজারের রামুতে উপজেলা কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। ১ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চাহিদামতো সার না পেয়ে কৃষকেরা এক ডিলারের দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন। কোথাও সার পাওয়া গেলেও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
রামুর কৃষকদের অভিযোগ, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং এমওপি সারের মূল্য ১ হাজার টাকা হলেও বাজারে এসব সার অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো সার না পাওয়ায় ফলন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়াতেও আমন মৌসুমে কৃষকদের সার পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার খবর এসেছে। অর্থাৎ প্রতিমন্ত্রীর চট্টগ্রাম বিভাগে সংকট হয়নি—এমন দাবির সঙ্গে অন্তত কিছু এলাকার মাঠপর্যায়ের সংবাদ প্রতিবেদনের অমিল দেখা যাচ্ছে।
কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলাতেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ অবশ্য পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা জানিয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
রাজশাহী বিভাগেও প্রতিমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে কিছু সংবাদ প্রতিবেদনের অমিল পাওয়া যায়। বগুড়ার শেরপুর, শাজাহানপুর, কাহালু ও দুপচাঁচিয়ায় কৃষকদের চাহিদামতো সার না পাওয়া এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কেনার অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বগুড়ার কৃষকদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের অতিরিক্ত দাম। কিছু ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও এসেছে।
রাজশাহীর পুঠিয়ায় সার কম দেওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা সড়ক অবরোধও করেছেন। ৭ সেপ্টেম্বর বানেশ্বরে রাজশাহী-নাটোর সড়কে এই অবরোধ চলে। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় পর সার নিতে এসেও তাদের চাহিদার তুলনায় খুব কম সার দেওয়া হচ্ছিল। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ তাদের সঙ্গে কথা বললে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
রাজশাহী বিভাগের পাবনাতেও সার সংকট নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তির খবর প্রকাশিত হয়েছে। চাহিদামতো সার না পাওয়ার পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের কথাও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নাটোরের সিংড়াতেও আমন মৌসুমে সারের সংকটের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কিছু এলাকায় সার বিতরণকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগে সারের সংকট হয়নি বলে প্রতিমন্ত্রীর দাবির মধ্যেও জামালপুর ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে।
জামালপুরে রোপা-আমন মৌসুমের শুরুতেই সার সংকটের পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সার কেনার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
নেত্রকোনার বারহাট্টায়ও সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তির খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত ডিলারদের কাছে সার বরাদ্দ থাকলেও সময়মতো তা গুদামজাত না করার অভিযোগ ওঠে।
ঢাকা বিভাগেও প্রতিমন্ত্রীর ‘সার সংকট হয়নি’ দাবির বিপরীতে গাজীপুর ও রাজবাড়ীতে কৃষকদের সার নিয়ে সমস্যার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কৃষকেরা।
রংপুর বিভাগের লালমনিরহাটেও সার নিয়ে কৃষকদের আন্দোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। ১০ আগস্ট কালীগঞ্জ উপজেলায় পর্যাপ্ত সার সরবরাহের দাবিতে কৃষকেরা লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
পরে ৬ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট সদরেও সার না পাওয়া এবং ডিলারদের অনিয়ম বন্ধের দাবিতে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। প্রশাসনের আশ্বাসের পর তারা অবরোধ তুলে নেন।
ফলে পাওয়া সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সারের সংকট নিয়ে সমস্যার ধরন সব এলাকায় এক নয়। কোথাও কৃষকেরা সরাসরি সার না পাওয়ার কথা বলেছেন, কোথাও চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে, আবার কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে কিছু এলাকায় কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করেছে। রামুর ক্ষেত্রেও কৃষি বিভাগের বক্তব্য ছিল, সেখানে পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের একাংশ চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
অর্থাৎ সরকারি মজুতের হিসাব এবং কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য আছে কি না—সেটিই বিভিন্ন প্রতিবেদনে মূল প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সারের সংকটকে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে বিএনপির সংসদ সদস্য থাকা একাধিক এলাকায় সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি ও আন্দোলনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য থেকে প্রতিমন্ত্রীর ‘বিএনপির এমপিদের এলাকায় সংকট হয়নি’—এই দাবিটি সর্বজনীনভাবে সমর্থিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে এসব সংবাদ প্রতিবেদন থেকে পুরো দেশের সার পরিস্থিতি সম্পর্কে একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যায় না। কারণ বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতি, সরকারি মজুত, ডিলারদের সরবরাহ এবং কৃষকদের অভিযোগ আলাদা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, বিএনপির সংসদ সদস্য থাকা একাধিক এলাকাতেও সার না পাওয়া, কম সরবরাহ, বেশি দামে বিক্রি এবং কৃষকদের আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।







