কুমিল্লায় কিশোরী জান্নাতুন তাজমীন (১৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক অটোরিকশাচালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার আসামি সুমন মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আসামি গ্রেফতার ও মোবাইল ফোন উদ্ধারের পরও হত্যাকাণ্ড ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ফলে ঘটনাটির রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমীনের ওপর যৌন নির্যাতন ও তাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এবং ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
৮ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে ঘুরেছেন ৩০ কিলোমিটার
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় তাজমীনের বাড়ি থেকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। অথচ বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ৩০০ টাকায় রাজি হওয়া সুমন তাকে নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে উল্টো পথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি নির্জন ধানখেতে নিয়ে যান।
এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিলেন কি না, কিংবা অন্য কেউ পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া তাজমীনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লায় বসবাস করায় এলাকার সড়ক ও অবস্থান সম্পর্কে তার ধারণা থাকার কথা। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশাটি শহরের দিকে না গিয়ে উল্টো পথে চললেও কেন তিনি বিষয়টি আগে বুঝতে পারেননি বা সাহায্য চাইতে পারেননি, তা নিয়েও রহস্য রয়েছে।
দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ধরে ঘোরানো হয়
শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, পদুয়ার বাজার থেকে তাজমীনের বাড়িতে পৌঁছাতে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাকে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, অটোরিকশা চলার সময় তাজমীন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তবে দীর্ঘ পথ চলার সময় কিশোরী কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, কোনো পর্যায়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কি না—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।
পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তাজমীন ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে বা সেখানে পৌঁছে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে হয়তো এমন মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।
নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যার অভিযোগ
পুলিশের দাবি, নির্জন এলাকায় পৌঁছানোর পর তাজমীন পালানোর চেষ্টা করলে সুমনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে যৌন নির্যাতন চালানোর কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন সুমন। পরে ধানখেতে নিয়ে পা দিয়ে মাথা চেপে ধরে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
তবে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। নির্যাতন হত্যার আগে, নাকি পরে সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়েও তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত নন।
বাবাকে পাঠানো হয়েছিল লাইভ লোকেশন
তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার রাতে ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিলেন। তখন ঘুমিয়ে থাকায় বাবা সেটি দেখতে পাননি। ভোরের দিকে লোকেশনটি দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন তিনি। এরই মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করছিল। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন বাবা।
তাজমীন ঠিক কী পরিস্থিতিতে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন কি না এবং লোকেশন পাঠানোর পর কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি। তবে এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় পর্যন্ত ফোনটি তার কাছে ছিল।
ধানখেত থেকে উদ্ধার মরদেহ ও অটোরিকশা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানখেত থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গামছা ছিল। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ির ভেতরে কাপড়চোপড় এবং পাশে একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশার পেছনের বাঁ পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে। গাড়িতে অন্য কেউ ছিলেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ জানায়, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পর ঘটে হত্যাকাণ্ড
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমীন। পরে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসে কুমিল্লায় ফেরে সে।
রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে তাজমীন। এরপর একটি দোকানে মোবাইল ফোন চার্জ দেয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় গিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় ওঠে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে ৪ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সে কীভাবে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি। ঘটনার পর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তাজমীন বুধবার রাতে বাড়ি ফিরবে বলে সেদিন বিকেলে পরিবারকে জানিয়েছিল।
হত্যার পর আইফোন নিয়ে পালিয়ে যান সুমন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর সুমন অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে তাজমীনের আইফোন নিয়ে চলে যান। পরে কচিকাটা মসজিদের কাছে একটি পুকুরে গোসল করেন। এরপর অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রাখেন। পরে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বাখরাবাদ এলাকা থেকে তাজমীনের আইফোন উদ্ধার করা হয়। ফোনটির বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে মিলবে বাকি প্রশ্নের উত্তর?
পুলিশ জানিয়েছে, তাজমীন হত্যাকাণ্ডের পেছনের সব ঘটনা এবং অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ৩০ কিলোমিটার পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, লাইভ লোকেশন পাঠানোর পর কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে।







