বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গান ও তৎকালীন রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব। তিনি দাবি করেছেন, ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের রচিত অধিকাংশ দেশাত্মবোধক গানই ছিল কলকাতার অভিজাত হিন্দু জনগোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের অংশ, যা মূলত তৎকালীন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বার্থের বিপক্ষে গিয়েছিল।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মির্জা গালিব রবীন্দ্রনাথের গান সংকলন ‘গীতবিতান’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গীতবিতানের প্রায় ২ হাজার ২০০টি গানের মধ্যে ৪৬টি দেশাত্মবোধক গান রয়েছে, যা ১৮৮৬ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে রচিত। এর মধ্যে সুদীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি কোনো স্বদেশি গান লেখেননি। তবে অবাক করার বিষয় হলো, ৪৬টি দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে ২৪টি গানই রচিত হয়েছিল একটি মাত্র বছরে—বাংলা ১৩১২ সনে (১৯০৫-০৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ড. মির্জা গালিব লেখেন, সে সময় ব্রিটিশ সরকার ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববাংলা ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠন করেছিল। শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলের তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী এর ফলে নতুন সুযোগের সম্ভাবনা দেখে বঙ্গভঙ্গকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু কলকাতাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য হারানোর আশঙ্কায় কলকাতার হিন্দু সমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলন গড়ে তোলে।
মির্জা গালিবের মতে, অবিভক্ত বাংলায় পিছিয়ে পড়া পূর্বাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার চেয়ে নিজেদের বিদ্যমান আধিপত্য বজায় রাখাই ছিল বঙ্গভঙ্গ বিরোধীদের মূল লক্ষ্য। ১৯১১ সালে আন্দোলনের চাপে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়াকে তিনি এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, ১৩১২ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা ২৪টি স্বদেশি গান ছিল মূলত কলকাতার সেই এলিট শ্রেণির রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজমের অংশ।
রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা ও রাজনৈতিক ভূমিকাকে আলাদা করে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, কবিমাত্রই রাজনীতির বাইরে নন এবং বাংলা ভাষার কবি মানেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক স্বার্থের পক্ষের কবি নন। পোস্টের শেষাংশে পাঠকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালো লাগে, পড়ুন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রাজনীতিটা করবেন না; কারণ সেটা বাংলাদেশি স্বার্থের রাজনীতি ছিল না।”







