জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি)-এর উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সাবেক কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন।
বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সমালোচনা
আলোচনায় ড. দিলারা চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন, “বিচার কেন থমকে আছে? যারা বিচার করবে না, আমরা ধরে নেব তারাও গুমের পক্ষাবলম্বন করছে।” গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এত বড় ঘটনার পর বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত না হওয়াকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদের আত্মত্যাগের মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিএনপির ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, দলটি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে একের পর এক জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করছে। জামায়াতকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক দূরত্বের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, “হঠাৎ কী ঘটল যে তাদের সঙ্গে বসা যাবে না? কার ইঙ্গিতে এই বার্তা আসছে?” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামী সমর্থন না দিলে বিএনপির রাজনীতি তখনই কঠিন সংকটে পড়ত। কৃত্রিম বিভেদ তৈরি করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনদের বক্তব্য
- আবুল হাসান চৌধুরী (সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী): জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিভাজন অতিক্রম এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন।
- অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান (সাবেক ভিসি, ঢাবি): শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ এবং সমাজিক আস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
- অধ্যাপক ড. নাইমা মোয়াজ্জেম: দুর্নীতিকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে দলমত-নির্বিশেষে তা প্রতিরোধের তাগিদ দেন। একই সাথে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানান।
- অধ্যাপক ড. আব্দুর রব: স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নৈতিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
- ড. মোহাম্মদ মিয়া (সাবেক সচিব): রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন।
- এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হুসাইন: জাতীয় সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
- অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী: ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের ছেলেরা আর কত রক্ত দেবে? বারবার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করলে জনগণ তা ক্ষমা করবে না।”
- সাকিব আলি (সাবেক কূটনীতিক): দায়িত্বশীল শাসনের অভাবের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএনপি সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করলে আজ জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নই উঠত না।
- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুদাসসের (বীর মুক্তিযোদ্ধা): মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
- রুবী আমানতউল্লাহ: একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
সভাপতির বক্তব্য ও সমাপনী
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসি-এর চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও আধিপত্যবিরোধী শক্তিকে রুখে দিতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “জাতীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর সাময়িক সমঝোতা নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান পূর্বশর্ত। অতীত রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ গঠনে নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”







