রাজনীতিতে যোগ্যতার মূল্য আছে, অভিজ্ঞতার মূল্য আছে, জনসেবারও মূল্য আছে। কিন্তু ওসবের মূল্যায়ন ও কদর নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এসবের চেয়ে বেশি মূল্যায়ন ও কদর বিশেষ এক ধরণের তেলের। যা দিয়ে ক্ষমতার সিঁড়িতে বেশ মসৃণভাবে ওঠা যায়।
তেলবাজির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে খুব বেশি যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। নেতার বক্তব্যের মধ্যে ভুল থাকলেও বলতে হবে, ‘স্যার, অসাধারণ বলেছেন!’ নেতা পাঁচ মিনিট কথা বললে বলতে হবে, ‘স্যার, আপনার পাঁচ মিনিটের বক্তব্যে পাঁচ বছরের গবেষণা আছে!’ নেতা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপাকে পড়লে বলতে হবে, ‘স্যার, আপনি ভবিষ্যৎ দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; আমরা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছি না।’
এই বিদ্যার চর্চা অবশ্য নতুন নয়। তবে ক্ষমতার রাজনীতিতে এর প্রয়োগ এত বিচিত্র যে, মাঝেমধ্যে মনে হয়—দেশ চালানোর পাশাপাশি কেউ কেউ বুঝি তেলবাজির ওপরও পিএইচডি করছেন! এ বিষয়ে দু’টি গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না।
গল্প এক: রাজার নতুন পোশাক
এক দেশে এক রাজা ছিলেন। নতুন পোশাক পরতে তাঁর খুব শখ। একদিন দুই ধূর্ত লোক এসে রাজাকে বলল, তারা এমন এক পোশাক তৈরি করতে পারে, যা শুধু বুদ্ধিমান ও যোগ্য লোকের চোখেই দেখা যাবে। বোকা মানুষেরা পোশাকটি দেখতে পাবে না।
রাজা তো মহাখুশি! ভাবলেন, এই পোশাক পরলে একদিকে নিজের আভিজাত্য বাড়বে, অন্যদিকে রাজ্যের বোকাদেরও শনাক্ত করা যাবে।
কিছুদিন পর পোশাক তৈরির নামে তাঁরা রাজদরবারে হাজির হলো। আসলে পোশাক বলে কিছুই ছিল না। কিন্তু রাজা তো আর স্বীকার করতে পারেন না যে তিনি কিছুই দেখছেন না! মন্ত্রীরাও একে একে বলতে লাগলেন, ‘হুজুর, কী অপূর্ব পোশাক! এমন পোশাক পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই!’ রাজাকে খুশি করতে করতে দরবারের সবাই পোশাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শেষ পর্যন্ত রাজা সেই অদৃশ্য পোশাক পরেই নগর পরিদর্শনে বের হলেন। পথে এক শিশু বলে উঠল, ‘রাজা তো কোনো পোশাকই পরেননি!’ শিশুটির কথা শুনে জনতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এতক্ষণে অনেকের মুখের কথা বেরিয়ে এল।
এই গল্পটি হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত The Emperor’s New Clothes কাহিনির কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পের মূল শিক্ষা হলো, ক্ষমতার সামনে সত্য বলার সাহস হারালে মিথ্যাও একসময় রাজকীয় পোশাক পরে বসে থাকে।
আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন নয়। নেতা একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, আর চারপাশের লোকজন সেটিকে যুগান্তকারী বলে প্রচার শুরু করল। সিদ্ধান্তে ভুল থাকলেও কেউ ধরিয়ে দিতে চায় না। কারণ ভুল ধরিয়ে দিলে নেতার অসন্তুষ্টির ঝুঁকি আছে; আর প্রশংসা করলে হয়তো পদ, পদোন্নতি কিংবা অন্য কোনো সুবিধার দরজা খুলে যেতে পারে। ফলে নেতার চারপাশে প্রশংসার দেয়াল যত উঁচু হয়, সাধারণ মানুষের অভিযোগ ততই বাইরে আটকে থাকে। নেতা শুনতে পান, সবকিছু চমৎকার চলছে। অথচ বাজারে গিয়ে মানুষ চাল-ডালের দাম দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সরকারি অফিসে গিয়ে সেবা পেতে হয়রান হয়, আর নিজের এলাকার সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে দিনের পর দিন ঘোরে।
রাজা অন্তত শেষ পর্যন্ত শিশুটির মুখে সত্য শুনেছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, অনেক সময় সেই শিশুটির কথাও শোনার আগেই তাকে ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘বিরোধী’ কিংবা ‘উন্নয়নবিরোধী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়!
গল্প দুই: শেয়ালের প্রশংসায় কাকের সর্বনাশ
ঈশপের একটি বিখ্যাত গল্প আছে। এক কাক কোথাও থেকে এক টুকরো পনির চুরি করে গাছের ডালে বসে খাচ্ছিল। নিচ দিয়ে যাচ্ছিল এক শেয়াল। পনির দেখে তার জিভে জল এল। কিন্তু গাছে উঠে পনির কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তাই সে বুদ্ধি খাটাল।
গাছের নিচে দাঁড়িয়ে শেয়াল কাকের রূপের প্রশংসা শুরু করল।‘আহা! কী সুন্দর তোমার পালক! কী রাজকীয় চেহারা! তোমার মতো সুন্দর পাখি বনে আর একটিও নেই। তোমার কণ্ঠস্বরও নিশ্চয়ই অসাধারণ! তুমি যদি একটু গান গাও, তবে তোমাকেই পাখিদের রাণী ঘোষণা করা উচিত!’
প্রশংসা শুনে কাকের মন গলে গেল। সে মনে মনে ভাবল, ‘বাহ! এত দিন তো জানতামই না, আমি এত গুণী!’ নিজের কণ্ঠের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সে যেই না মুখ খুলে গান গাইতে গেল, অমনি পনিরের টুকরোটি নিচে পড়ে গেল। শেয়াল পনির মুখে পুরে চলে যেতে যেতে বলে গেল, ‘প্রশংসা শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু প্রশংসাকারীর উদ্দেশ্যটা বুঝতে হয়!’
গল্পটি ছোট, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে এর মিল বেশ গভীর। শেয়াল জানত, কাকের গুণগান করে কোনো মতে পনিরটা হাতিয়ে নিতে পারলেই তার লাভ। রাজনীতির তেলবাজরাও অনেক সময় একই কৌশলে কাজ করেন। তাঁদের মুখে নেতার উন্নয়ন, দূরদর্শিতা, জনপ্রিয়তা আর অতুলনীয় নেতৃত্বের প্রশংসা লেগেই থাকে। কিন্তু সেই প্রশংসার পেছনে থাকে পদ-পদবি, মনোনয়ন, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার হিসাব।
নেতা যখন প্রশংসায় আত্মহারা, তখন তেলবাজের কাজ প্রায় শেষ। তিনি নিজের সুবিধাটুকু বুঝে নেন; আর নেতা বুঝতে পারেন না, কখন তাঁর হাত থেকে জনস্বার্থের পনিরটুকু খসে পড়েছে!
তেলের লাভ কার, ক্ষতি কার?
রাজনীতিতে তেলবাজির বাজার গরম থাকলে তেলবাজদের লাভ হয়—এ কথা বুঝতে অর্থনীতির বই পড়তে হয় না। কেউ পদ পান, কেউ মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এগিয়ে থাকেন, কেউ ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন, আবার কেউ নেতার কাছাকাছি থাকার সুবাদে নিজের প্রভাব বাড়ান।
কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এই সুবিধার মূল্য কাকে পরিশোধ করতে হয়? এর মূল্য পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ। যখন যোগ্যতার বদলে আনুগত্য পুরস্কৃত হয়, তখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ভুল লোক বসার ঝুঁকি বাড়ে। যখন সমস্যার বদলে প্রশংসার খবর ওপরে পৌঁছায়, তখন সিদ্ধান্তও বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায়। আর যখন জনসেবার চেয়ে নেতাকে খুশি করা বড় কাজ হয়ে দাঁড়ায়, তখন জনগণকে সেবা পেতে গিয়ে বারবার সরকারের দ্বারে দ্বারে কড়া নাড়তে হয়।
এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার, নেতার প্রশংসা করা মানেই তেলবাজি নয়। ভালো কাজের প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রশংসা সত্যের ওপর দাঁড়ায় না; যখন ভুলকে ভুল বলার সাহস থাকে না; যখন ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য নীতির প্রতি দায়িত্বকে হারিয়ে দেয়। একজন ভালো নেতা এমন মানুষ চান, যিনি তাঁর ভুল ধরিয়ে দেবেন। আর একজন তেলবাজ চান এমন নেতা, যিনি নিজের ভুল কখনো বুঝতেই পারবেন না।
তেল দিয়ে চাকা চলে, রাষ্ট্র নয়
যন্ত্রের চাকা মসৃণ রাখতে তেল দরকার। কিন্তু রাষ্ট্রের চাকা চালাতে দরকার যোগ্যতা, জবাবদিহি, সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। সেখানে তেলের আধিক্য হলে চাকা মসৃণ হওয়ার বদলে পুরো রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থাই পিছলে যেতে পারে। রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক তেলবাজ সেই ব্যক্তি, যে নেতাকে শুধু প্রশংসা করে তা নয়; বরং নেতার চারপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সত্য বলা অপরাধ আর মিথ্যা বলা আনুগত্যের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই নেতাদেরও একটু সাবধান হওয়া দরকার। চারপাশে যারা সারাক্ষণ ‘আপনি ঠিক, আপনি মহান’ বলে, তাদের সবাই বিশ্বস্ত নাও হতে পারেন। কখনো কখনো যে মানুষটি মুখের ওপর ভুল ধরিয়ে দেন, তিনিই হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। এক্ষেত্রে জনগণের জন্য কথাটা আরও সরল। নেতার গায়ে তেল মাখানোর খরচ জনগণের পকেট থেকেই কাটা হয়, আর সেই তেলে নেতার পিছলে পড়ার খেসারতও দিতে হয় জনগণকে।
লেখক: সম্পাদক, আজাদির ডাক







