জয়পুরহাটে ঐতিহাসিক ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি আলোচনা সভায় নজিরবিহীন হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানমঞ্চের মূল ব্যানারে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি অনুপস্থিত থাকা এবং পরবর্তীতে এক বক্তার বক্তব্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) সকাল ১০টায় জয়পুরহাট জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মূল ব্যানারে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকায় সেখানে উপস্থিত স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্যানার ত্রুটির কারণে প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী মঞ্চে ওঠায় বিলম্ব ঘটায় নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মঞ্চে গিয়ে তড়িঘড়ি করে মূল ব্যানারটি নামান। এরপর জিয়াউর রহমানের ছবি সংবলিত একটি আলাদা পোস্টার কসটেপ দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সেই ব্যানারে সংযুক্ত করা হয়। ব্যানার ঠিক হওয়ার পর প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী মঞ্চে আসন গ্রহণ করলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা পর আলোচনা সভা শুরু হয়।
তবে প্রথম দফার উত্তেজনা প্রশমিত হলেও সভা চলাকালীন দ্বিতীয় দফায় আবারও বড় ধরনের হট্টগোল শুরু হয়। সভা চলাকালে জিয়া পরিষদের জয়পুরহাট পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক মারুফ হাসান তাঁর বক্তৃতার সময় একাধিকবার শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। এই শব্দচয়ন ও সম্বোধনের পরেই সভাস্থলে উপস্থিত বিএনপির নেতা-কর্মীদের মাঝে তীব্র উত্তেজনার আগুন জ্বলে ওঠে।
পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এ কে এম গোলাম মাহফুজ শুভ ইসলাম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি ডায়াসের দিকে এগিয়ে যান। পরে তাৎক্ষণিকভাবে ওই বক্তাকে ডায়াস থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় জেলা ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও মারাত্মক ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে হাতজোড় করে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন জেলা প্রশাসক আল-মামুন মিয়া। তিনি সাফাই গেয়ে জানান, ইন্টারনেট থেকে ছবি সংগ্রহ করে ব্যানারটি তৈরি করা হয়েছিল বলেই এই অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছে।
অন্যদিকে পুরো ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি স্রেফ ভুল নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখতে তিনি জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের প্রশাসককে অবিলম্বে যৌথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ ওহাব এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা তীব্র নিন্দা জানান। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করা হচ্ছে। অথচ শহীদ জিয়াউর রহমানের ছবি ছাড়া ব্যানার ছাপানো অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও ক্ষমার অযোগ্য। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের কোনো গভীর চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশই হলো এই বিশৃঙ্খলা।
উল্লেখ্য, চরম উত্তেজনা ও দুই দফা হট্টগোলের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই সংঘাতপূর্ণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে পুলিশ সুপার শাহনাজ বেগম, সিভিল সার্জন ডা. আল-মামুন এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলজার হোসেনসহ প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।







