ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি যদি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে সক্ষম হন, তবে তিনি হবেন ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম কোনো মিজরাহি বা অ-আশকেনাজি বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী। উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোয় পারিবারিক শিকড় থাকা এই নেতার সম্ভাব্য উত্থান দেশটির দীর্ঘদিনের জাতিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলে গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন অর্জন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন নিয়ে এককভাবে বৃহত্তম দল হলেও, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের রাজনৈতিক দরকষাকষিতে আইজেনকটের সামনে নতুন ও শক্তিশালী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর দেশটির প্রেসিডেন্ট ইজ্যাক হারজগের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ পর্ব শেষে জানা যায়, ১২০ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ৬৭ জন আইনপ্রধাতা গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ৪৬ জন সংসদ সদস্য। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক মতবিরোধ ও জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত কে কার্যকরভাবে সরকার গঠন করতে পারবেন, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ৮ নভেম্বর সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে কথা রয়েছে।
ইসরায়েলের ইহুদি সমাজের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে ‘আশকেনাজি’ ও ‘মিজরাহি’—এই দুটি প্রধান পরিচয় অত্যন্ত প্রভাবশালী। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ কিংবা রাশিয়ায় শেকড় থাকা ইহুদিরা আশকেনাজি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদিরা মিজরাহি বা সেফার্দি পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৭-৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি ইহুদিরা দেশটির রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তিতে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রেখে আসছে।
তুলনামূলকভাবে মরক্কো, ইরাক, ইয়েমেন, ইরান ও সিরিয়াসহ আরব-ইসলামি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসন করে আসা মিজরাহি ইহুদিদের দীর্ঘদিন ধরে সমাজের প্রান্তিক স্তরে রাখা হয়েছিল। নতুন এই রাষ্ট্রে আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি ব্যাপক বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইহুদিদের তুলনায় তাদের সংস্কৃতি ও আরবি ভাষার চর্চাকে অনুুন্নত হিসেবে দেখা হতো বলে ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন।
জনসংখ্যায় মিজরাহি ইহুদিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেলেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও শীর্ষ ক্ষমতাগুলোতে তাদের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি বরাবরই প্রকট ছিল। এই কাঠামোগত বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রতিবাদে ১৯৭০-এর দশকে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার্স’ নামে একটি প্রতিবাদী আন্দোলনও গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে মিজরাহি ও সেফার্দিদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ‘শাস (Shas) পার্টি’ গঠিত হয়। অতীতে শাউল মোফাজ বা আমির পেরেতজের মতো মিজরাহি বংশোদ্ভূত কিছু নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলেও কেউই কখনো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারেননি।
১৯৬০ সালে তিবেরিয়াস শহরে জন্ম নেওয়া গাদি আইজেনকটের বাবা-মা উভয়ের পরিবারই মরক্কো থেকে এসেছে—তাঁর বাবা মারাকেশের এবং মা কাসাব্লাংকার সন্তান। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি ব্রিগেডে যোগ দিয়ে তিনি সামরিক জীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ কর্মপরিক্রমায় সেনাপ্রধানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তবে শীর্ষ সামরিক পদে পৌঁছালেও তাঁর মরক্কান বংশপরিচয় ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক শেকড় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সময় তাকে বিদ্রূপ ও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহুর দল ও কট্টরপন্থীরা আইজেনকটকে ‘আরব’ ও ফিলিস্তিনপন্থಿ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বর্তমান সেনাপ্রধান আইয়াল জামির এবং সাবেক শিন বেতপ্রধান ইয়োরাম কোহেনসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ভিনদেশি শেকড়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও এ ধরনের পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য ও আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে আইজেনকটের সামনে বড় বাধা হলো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ মেলানো। নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের দলগুলোর হাতে রয়েছে ৪৮টি আসন। প্রেসিডেন্টর সঙ্গে বৈঠকে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল আইজেনকটকে সমর্থন দিলেও, আইজেনকট নিজে সেই আরব দলগুলোকে সরাসরি সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত নন। ফলে ৬১ আসনের ম্যাজিক ফিগার অর্জন করা তাঁর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। অন্যদিকে, অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক নিয়োগ ছাড়ের ইস্যু নিয়ে নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী মিত্রদের অসন্তোষও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর আইজেনকটকে ২৮ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার তীব্র মতপার্থক্য ও দূরত্ব ঘুচিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে পারলে তা শুধু ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের আশকেনাজি রাজনৈতিক একাধিপত্যের অবসানই ঘটাবে না, বরং দেশটির জাতিগত প্রতিনিধিত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে।







