ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত পদ্মা সেতু রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার লোহা ও সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার লোহা চুরি করে বিক্রি করা হয়েছে। এই চুরির সঙ্গে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য এবং চায়না প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেললাইন স্থাপন প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও চীনের সরকারের মধ্যে জিটুজি চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। চীনের চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ (সিআরইসি) এ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণের কাজ চলছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে ২০২4 সালের আগস্ট থেকে। সেই সুযোগে কেরানীগঞ্জের কাজীরগাঁও এলাকায় সিআরইসির সাইট অফিস সংলগ্ন স্থান থেকে প্রতিদিনই লোহা চুরির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ট্রাকভর্তি লোহা কেটে টুকরো করে বাইরে পাচার করা হয়। এসব লোহা পরে পোস্তগোলার এনএস ট্রেডার্সে বিক্রি করা হয়, যেখানে প্রতি কেজি লোহা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় কেনা হয় বলে দোকান মালিক নয়ন শেখ স্বীকার করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুরির মূল নেতৃত্বে রয়েছেন কাজীরগাঁওয়ের লিটন ও সজীব। তাদের সহযোগিতা করছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতা, যাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা জেলা দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি পাভেল মোল্লা, থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব জুয়েল, যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন ইসলাম রনি, শ্রমিক দলের নেতা সোবাহানসহ আরও অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, তারা চুরি হওয়া লোহার বিক্রির টাকা থেকে নিয়মিত ভাগ পান।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি সৈয়দ আখতার হোসেন বলেন, তিনি যোগদানের পর থেকেই লোহা চুরির বিষয়টি তার নজরে আসে। প্রতিদিনই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিছু এলাকায় সেনাবাহিনীর সহায়তায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। তবে তার থানার কোনো পুলিশ সদস্য চোরচক্রে জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা জেলা দক্ষিণ ডিবির ওসি সাইদুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দুই ট্রাক চুরি হওয়া লোহাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। মামলার বাদী ছিলেন প্রকল্পের তৎকালীন নিরাপত্তা ইনচার্জ সাকানুর হাসান।
বর্তমান নিরাপত্তা ইনচার্জ নাজমুল হুদা খান বলেন, স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন নেতা-কর্মী এই চুরির সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, এসব চুরির প্রতিবাদ করায় তিনি প্রায়ই অজ্ঞাত নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি পান, ফলে ভয়ে কিছু বলতে পারেন না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ছাত্রদল নেতা পাভেল মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও এমন ঘটনা ঘটলে তিনি অশালীন ভাষায় প্রতিবাদ করে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তাদের দাবি, কেরানীগঞ্জে এমন কোনো অপরাধ নেই, যাতে তার সংশ্লিষ্টতা নেই।
