কানাডায় ভিসা ও অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির সরকার এমন একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যক ভিসা একসঙ্গে বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। এই পরিকল্পনার আওতায় ভারত ও বাংলাদেশকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সোমবার (৪ নভেম্বর) কানাডার অভিবাসন দপ্তর ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC) ও কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (CBSA)-এর এক যৌথ উপস্থাপনায় এ তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে মিলে একটি বিশেষ কর্মগোষ্ঠী গঠন করা হয়েছে, যারা প্রতারণামূলক বা সন্দেহজনক ভিসা আবেদন শনাক্ত করে তা বাতিল করবে।
উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, এই উদ্যোগ মূলত “দেশভিত্তিক চ্যালেঞ্জ” মোকাবিলার অংশ, যেখানে ভারত ও বাংলাদেশকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কানাডার অভিবাসন মন্ত্রী লেনা দিয়াব জানিয়েছেন, এই ক্ষমতা মূলত যুদ্ধ বা মহামারির মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হবে। তবে অভ্যন্তরীণ নথিতে দেশভিত্তিক ভিসা বাতিলের প্রস্তাব উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে একটি বিল পার্লামেন্টে তুলেছে, যার মাধ্যমে এই ‘গ্রুপ ভিত্তিক ভিসা বাতিলের ক্ষমতা’কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার দ্রুত বিলটি পাস করাতে চাইছে।
কানাডায় শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত আগস্টে দেশটি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই ভিসা পাননি।
অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ভারতের নাগরিকদের আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) দাবির সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। মে ২০২৩-এ মাসে যেখানে ৫০০ জনেরও কম দাবি জানিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২,০০০ জনে।
এই বৃদ্ধির কারণে ভিসা যাচাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গড় প্রসেসিং সময় ছিল ৩০ দিন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ দিন। এতে অনুমোদনের সংখ্যা কমে যায়— জানুয়ারি ২০২৪-এ যেখানে ৬৩ হাজারের বেশি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, জুনে তা নেমে আসে প্রায় ৪৮ হাজারে।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, অঞ্চল বা দেশের আবেদন একসাথে বাতিল করতে পারবে। এটি কার্যকর হলে কানাডা প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় “মাস ভিসা ক্যানসেলেশন”-এর ক্ষমতা পাবে।
তবে মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলো এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে। তারা বলছে, এই ক্ষমতা এক ধরনের “গণনির্বাসন প্রক্রিয়া” চালুর পথ খুলে দিতে পারে, যা বিদেশিদের প্রতি বৈষম্য বাড়াবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ নাগরিক সংগঠন এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার এই নীতি মূলত ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণা রোধের উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ভারত ও বাংলাদেশের আবেদনকারীদের ওপর। এতে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর শিক্ষার্থী, কর্মী ও অভিবাসীদের জন্য কানাডার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১,৮৭৩ জন ভারতীয় যাত্রীকে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এবং তাদের ‘প্রসিডিউরাল ফেয়ারনেস লেটার’ পাঠানো হয়েছে— যেখানে তাদের অধিকার ও আপিলের সুযোগের কথা জানানো হয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে কানাডার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক এই নীতি পরিবর্তন দুই দেশের সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডা এখন এমন এক নীতির দিকে যাচ্ছে যেখানে নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে— যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশীয়দের ওপরই।
