মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করেও শেখ হাসিনার আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা হয়েছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানে। ২০১৩ সালে পাবনার আতাইকুলার বনগ্রামে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনায় এ চিত্র স্পষ্ট হয়।
তৎকালীন পাবনা–১ আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর প্রভাবেই ওই মামলাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সুবিধা নেয় এবং বিএনপি–জামায়াতের নির্দোষ নেতাকর্মীদের আসামি করে জেল-জরিমানা দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হিন্দু যুবক রাজীব সাহা (১৭)-এর ফেসবুকে মহানবী (সা.)–কে কটূক্তি করে ছবি পোস্ট করার মাধ্যমে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভ হয় এবং অভিযুক্তের বাড়িতেও হামলা ও ভাঙচুর হয়। পরদিন আতাইকুলা থানার এসআই আবদুল হালিম তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তবে তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার পর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়, তারা সবাই বিএনপি–জামায়াতের কর্মী। অথচ আদালতে ১৫ জন সাক্ষীই আসল অপরাধী হিসেবে রাজীব সাহার নাম উল্লেখ করেন। অভিযোগপত্রে রাজীবকে বাদ দেওয়া হয় অদৃশ্য কারণে—এমন দাবি স্থানীয়দের।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদকারী দুই যুবক—আমিমুল এহসান ও জহিরুল ইসলাম—কে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়, যা পরে তারা আদালতে প্রত্যাহার করেন। তবুও রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল প্রত্যাহারকৃত সেই দুই জবানবন্দির ওপর ভর করে তিনজনকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা দেয়।
জামিনে থাকা জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। শুধুমাত্র পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ফাঁসানো হয়েছে তাদের। আমিমুলও দাবি করেন, পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে। আরেক আসামি খোকনের পরিবার জানিয়েছে, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়।
হাইকোর্টের আইনজীবী শাহীন মণ্ডল বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারব্যবস্থার ভাঙনের এক প্রকট উদাহরণ এই মামলা। মহানবী (সা.) অবমাননার মতো সংবেদনশীল অভিযোগও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বিতর্কিত আইসিটি আইনসহ এ–সংক্রান্ত সব মামলা ও রায় বাতিলের দাবি জানান।
আইনজীবী ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার জানান, ২০২১ সালে এ মামলার রায় দেওয়া হয়; তিন আসামিকে ১০ বছর কারাদণ্ড হয়। অথচ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা ২০১৮ সালে বাতিল করা হয়েছিল, পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও পরিবর্তিত হয়ে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ হয়, যা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পুরোপুরি বাতিল করেছে। তা সত্ত্বেও এসব পুরোনো আইনে দেওয়া বহু মামলা ও দণ্ড এখনও বহাল আছে।
