ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সারাদেশে বইছে নির্বাচনী আমেজ। পোস্টারে ছেয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট ও দেয়াল, পাড়ামহল্লায় চলছে গণসংযোগ, সভা-মিছিলসহ নানা প্রস্তুতি। চায়ের দোকানে প্রতিদিনই উঠছে প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল আগেই একক প্রার্থী ঘোষণা করে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছে। তবে বিএনপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভাজন।
পছন্দের নেতা মনোনয়ন না পাওয়ায় তৃণমূলে হতাশা, ক্ষোভ ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মিছিল-সমাবেশ করছেন। কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এমনকি ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসও তারা আলাদাভাবে পালন করেছেন। অন্যদিকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে সমর্থন চাইছেন।
জামায়াতের একক প্রার্থী নিয়ে তৎপরতা
রংপুরের ছয়টি আসন ঘুরে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে ধরে নিয়ে বেশ আগেই প্রচারে নেমেছেন জামায়াত নেতাকর্মীরা। প্রথম থেকেই দাঁড়িপাল্লার নমিনি ঘোষণা হওয়ায় তারা মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন বলে দাবি করছেন দলীয় নেতারা।
ছয় আসনের প্রার্থীরা
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশনের ৯ ওয়ার্ড):
বিএনপি: মোকাররম হোসেন সুজন
জামায়াত: অধ্যাপক রায়হান সিরাজী
রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ):
জামায়াত: এটিএম আজহারুল ইসলাম
বিএনপি: মোহাম্মদ আলী সরকার
রংপুর-৩ (সদর ও সিটি করপোরেশন):
জামায়াত: অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল
বিএনপি: শামসুজ্জামান সামু
রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা):
বিএনপি: ইমদাদুল হক ভাষা
জামায়াত: অধ্যাপক এটিএম আজম খান
এ আসনে এনসিপির আখতার হোসেনও প্রচারে আছেন।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর):
জামায়াত: অধ্যাপক গোলাম রব্বানী
বিএনপি: মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ):
বিএনপি: সাইফুল ইসলাম
জামায়াত: মাওলানা নুরুল আমিন
তৃণমূলে ক্ষোভের কারণ
বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েক নেতা অভিযোগ করেন—
রংপুর-১, ২ ও ৩ আসনে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তারা আওয়ামী লীগপন্থী সুবিধাভোগী এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে বিতর্কিত।
তারা দুর্দিনে দলের পাশে ছিলেন না, বরং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে সুবিধা নিয়েছেন।
জুলাই বিপ্লবের পর তারা চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্ত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের পুনর্বাসন করেছেন।
ফলে তৃণমূল নেতারা তাদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে দূরে সরে গেছেন। অনেকে এখন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন, আলাদা কর্মসূচিও পালন করছেন, যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হচ্ছে।
এ নেতারা দাবি করেন, মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে বিতর্কিত হওয়ায় তারা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও জটিল করছে।
বিভিন্ন আসনের স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
রংপুর-২:
বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল হক মানিক বলেন—
মোহাম্মদ আলী “অনুপ্রবেশকারী” এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত; তিনি অতীতে জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন ও কবরস্থান-এতিমখানার জমি দখলের অভিযোগও আছে। তার সঙ্গে স্থানীয় কেউ নেই।
জামায়াতের অবস্থান:
জামায়াতের নেতারা বলেন—
তাদের প্রার্থীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, পরিচ্ছন্ন এবং কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নেই। ফলে তৃণমূল একতাবদ্ধ হয়ে মাঠে কাজ করছে।
প্রার্থীদের মন্তব্য
রায়হান সিরাজী (জামায়াত, রংপুর-১): জনগণের সাড়া পাচ্ছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ের আশা।
নুরুল ইসলাম সুজন (বিএনপি, রংপুর-১): নেতাকর্মীদের মধ্যে বড় বিভেদ নেই।
এটিএম আজহার (জামায়াত, রংপুর-২): দীর্ঘ কারাবাসের পরও জনগণ তার পাশে, গণসমর্থন বাড়ছে।
আলী সরকার (বিএনপি, রংপুর-২): শুরুতে নেতাকর্মীরা না থাকলেও পরে সবাই একত্র হবে।
সামসুজ্জামান সামু (বিএনপি, রংপুর-৩): বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবাই একজোট হবে।
মাহবুবুর রহমান বেলাল (জামায়াত, রংপুর-৩): দলে কোনো কোন্দল নেই, বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
ইমদাদুল হক ভরসা (বিএনপি, রংপুর-৪): পূর্বে ছিলেন প্রার্থী, এবারও জয়ের আশা।
এটিএম আজম খান (জামায়াত, রংপুর-৪): জনগণ ন্যায়ের পথে, দাঁড়িপাল্লাকে ভোট দেবে।
আখতার হোসেন (এনসিপি): জুলাই বিপ্লবের চেতনায় জনগণ এনসিপির পক্ষে।
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (জামায়াত, রংপুর-৫): নির্যাতনের ইতিহাসই তাদের শক্তি, বিপুল ভোটে জয়ের আশা।
গোলাম রব্বানী (বিএনপি): নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ।
সাইফুল ইসলাম (বিএনপি, রংপুর-৬): কোন্দল নেই, আগেই মাঠে নেমেছেন।
মাওলানা নুরুল আমিন (জামায়াত, রংপুর-৬): পোস্টার বিকৃত করে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, এতে জনগণ আরও কাছে আসছে।
বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান
রংপুর-২ আসনে বিএনপির আজিজুল হক ও রংপুর-৩ আসনে মাহফুজুর নবী ডন স্বতন্ত্রভাবে প্রচারে রয়েছেন। তারা মনে করেন, তৃণমূলের সমর্থন তাদের দিকেই আছে এবং মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা জরুরি।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা সরোয়ার জাহান ও আইনজীবী বায়েজীদ ওসমানী বলেন—
এটিএম আজহারুল ইসলাম পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাজনীতিবিদ; তার পক্ষে দলমতনির্বিশেষে মানুষের সমর্থন দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, রংপুরের বিভিন্ন আসনে জামায়াতের পক্ষে এবার গণজোয়ার তৈরি হয়েছে।







