আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে তিনটি সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনায় রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারিকেই প্রধান তারিখ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি না হলে ওই দিনই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি এবার ভোটের দিনসহ দুদিন সরকারি ছুটি রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, পোস্টাল ব্যালটসহ নানা বিষয় বিবেচনায় রেখে এবার তফসিল ঘোষণার পর ভোটের ব্যবধান দুই মাসের মতো রাখা হবে, যা আগের চেয়ে বেশি। আগামী ৭ বা ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে তফসিল ঘোষণা করবেন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল একই সঙ্গে ঘোষণা করা হবে। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠানের কথা জানান।
এরই মধ্যে ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত হয়েছে এবং জারি করা হয়েছে। এতে গণভোট পরিচালনার সকল বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে ব্যবহৃত ব্যালট হবে সাদা এবং গণভোটে রঙিন ব্যালট ব্যবহৃত হবে। ‘জুলাই চার্টার’–সংক্রান্ত একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ/না’ ভোট দিতে হবে জনগণকে।
ভোটার তালিকা ও নতুন ভোটার
দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন—
পুরুষ: ৬,৪৮,১৪,৯০৭
নারী: ৬,২৮,৭৯,০৪২
তৃতীয় লিঙ্গ: ১,২৩৪ জন
৫ ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ছাপা হবে। প্রবাসী ভোটাররাও এবার পোস্টাল ব্যালটে অংশ নিতে পারবেন। পাঁচ কোটির বেশি নতুন তরুণ ভোটার এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন।
প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
দেশজুড়ে ৪২,৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২,৪৪,৭৩৯টি ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ১ লাখ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট আট লাখের বেশি সদস্য মাঠে থাকবে।
ইসি ইতোমধ্যে ব্যালট বাক্সসহ ২৭ ধরনের নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রস্তুত রেখেছে। ইভিএম ব্যবহার না করে এবার পুরো ভোটই ব্যালট পেপারে নেওয়া হবে।
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় সমন্বয়ের জন্য আগামী শনিবার মক ভোটিং আয়োজন করা হচ্ছে।
আইনি পরিবর্তন ও নীতিমালা
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ইসি বেশ কিছু নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে—
পলাতক কোনো অপরাধী নির্বাচন করতে পারবে না।
সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একক প্রার্থী হলে ‘না’ ভোটের সুযোগ থাকবে।
প্রার্থীদের বিদেশে সম্পদ ঘোষণা বাধ্যতামূলক।
আচরণবিধি ভাঙলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ড।
প্রচারের পোস্টার নিষিদ্ধ, কেবল ছোট সাদা-কালো প্রচারপত্র রাখা যাবে।
এআই-সম্পর্কিত অনিয়ম নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে; এজন্য বিশেষ সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং ডেস্ক করা হবে।
প্রবাসীদের জন্য প্রথমবার অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ভোটের সুযোগ।
রাজনৈতিক তৎপরতা
আওয়ামী লীগ তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। বিএনপি ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা দিয়েছে; বাকি আসনগুলো শরিকদের জন্য রাখা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও প্রায় ১৫০ আসনে পরিবর্তন হবে। এদিকে ইসলামি ও বামধারার কয়েকটি দল বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরে জোটবদ্ধ হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে ইশতেহার ও নির্বাচনী কৌশল তৈরির কাজ শুরু করেছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের ভাষ্যমতে, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হবে—এ নিয়ে কমিশনের প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন। আগামী শনিবার শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ মক ভোটিং করা হবে, যেখানে কেন্দ্র সংখ্যা, ভোটকক্ষ, সময়ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা যাচাই করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ জানিয়েছেন, সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ৫, ৮ ও ১২ ফেব্রুয়ারি আলোচনা হচ্ছে, তবে সিদ্ধান্ত হবে কমিশন সভায়। আরেক কমিশনারের মতে, ৪–৫ দিনের মধ্যেই তফসিল ও ভোটের তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে।
